অনলাইন জুয়ায় শতকোটি টাকার সম্পদ অর্জন: গ্রেপ্তার ‘ক্যাসিনো রুবেল’ প্রকাশিত: ৩:০৩ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ৮, ২০২৬ অনলাইন জুয়া ও ডিজিটাল পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেন, অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জন এবং বিদেশে টাকা পাচারের অভিযোগে হবিগঞ্জের শরীফপুর গ্রামের রুবেল মিয়াকে (৩৭) গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এলাকায় ‘ক্যাসিনো সম্রাট রুবেল’ নামে পরিচিত এই ব্যক্তির উত্থান ও বিপুল অবৈধ সম্পদের তথ্য সামনে আসায় সিলেট অঞ্চলজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। গত ২ অক্টোবর সন্ধ্যায় দুবাই পালিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গেলে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রথমে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের একটি হত্যা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হলেও পরে পল্টন থানার ডিজিটাল প্রতারণা মামলায় হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে মামলাটির তদন্ত ভার দেওয়া হয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ডিবি দক্ষিণ বিভাগকে। ডিবি দক্ষিণ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শুধু একটি অ্যাপ নয়, নির্দিষ্ট সময় পর পর নতুন অ্যাপ ব্যবহার করে জুয়া পরিচালনা করতেন রুবেল, যার নিয়ন্ত্রণ ছিল তার হাতেই। পুলিশ ও মামলার নথি সূত্রে জানা যায়, মার্কিন কোম্পানির প্রলোভন ও ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করে harrywinstongold.vip নামক ভুয়া অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে ঢাকার পল্টন মডেল থানায় মামলাটি করেন মো. আকবর হোসেন। মামলা অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২২ জুন থেকে ৬ আগস্ট পর্যন্ত আসামিরা তাকে নানা প্রলোভন দেখিয়ে ৭০ লাখ টাকা বাগিয়ে নেয় এবং মোট ৭৬ লাখ ৩৬ হাজার টাকা আত্মসাৎ করে। এজাহারে রুবেল মিয়াকে অনলাইন জুয়া ও প্রতারণাচক্রের ‘এশিয়া অঞ্চলের কান্ট্রি ডিরেক্টর’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি দেশের অনলাইন জুয়ার প্রধান হোতা হিসেবে ডিএমপির সিটি সাইবার ক্রাইম ইউনিট তাকে গ্রেপ্তার করেছিল এবং তার বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্রও দাখিল করে। তবে জামিনে মুক্ত হয়ে তিনি আবারও সারা দেশে জুয়ার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ শুরু করেন। স্থানীয় তথ্য ও অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০১২ সালেও রুবেলের বাবা আব্দুল লতিফ ছিলেন দিনমজুর ও ভ্যানচালক। রুবেল নিজে গ্রামে চায়ের দোকান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। হবিগঞ্জের লস্করপুর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. উজ্জ্বল জানান, আলাদিনের চেরাগের মতো রুবেলের এই উত্থান দেখে এলাকার উঠতি বয়সের তরুণরাও অনলাইন জুয়ায় জড়িয়ে পড়েছে। তিনি জানান, রুবেলের বর্তমানে দৃশ্যমান সম্পত্তির মূল্যই শতকোটি টাকার কাছাকাছি হবে, আর সরকারি সংস্থাগুলো গভীরে অনুসন্ধান চালালে অদৃশ্য আরও কয়েকশ কোটি টাকার সম্পদ বেরিয়ে আসবে। রুবেলের বেশিরভাগ অর্থই দুবাইয়ে পাচার করা হয়েছে এবং সেখান থেকে অনলাইন জুয়া পরিচালনা করা হচ্ছিল। সাবরেজিস্ট্রার অফিসের নথি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত ৫ বছরে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন স্থানে রুবেল ও তার পরিবারের নামে কেনা সম্পত্তির বাজারমূল্য ১০০ কোটি টাকারও বেশি। এর মধ্যে সুলতানশী মৌজায় ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে একাধিক দলিলের মাধ্যমে জমি রেজিস্ট্রি করা হয়—যার মধ্যে ২০১৯ সালের ১৬০০ নম্বর দলিলে ৯ শতক, ২০২১ সালের ৩৮২৯ নম্বর দলিলে ১০ শতক, ২০২২ সালের ৭৪১৫ ও ৫১১৫ নম্বর দলিলে ৪৬.৮ শতক ও ১০ অযুতাংশ এবং ২০২৩ সালের ৫৬৩৪ ও ৫৬ ৩৫ নম্বর দলিলে ২৫ শতক জমি রয়েছে। এছাড়া সুলতানশী মৌজায় রুবেলের নামে ১৫ বিঘা এবং তার ভাই সোহাগসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যের নামে ১৭ বিঘা জমি পাওয়া গেছে। পাশাপাশি ২০২২ সালে যমুনাবাদ মৌজায় ৪৬১৮ নম্বর দলিলে ১৫ শতক, দারিয়া মৌজায় ১ একর ৭৬ শতক এবং ২০২৪ সালে আনন্দপুর পৌরসভা এলাকায় ১৪০৩ নম্বর দলিলে ১১.৭২ শতক জমি ও বাড়ি কেনা হয়। স্থাপাবর সম্পত্তির বাইরেও কটিয়াদী বাজারে ১০ শতক জায়গার ওপর বিলাসবহুল মার্কেট, শ্রীমঙ্গলে পল্লীবিদ্যুৎ অফিসের কাছে ৮ শতক জমিতে ৪ তলা ভবন, রেলগেটের কাছে ১০ শতকের ওপর ৩ তলা ভবন ও ১০০ বিঘার বেশি জায়গায় রিসোর্ট বানিয়েছেন তিনি। হবিগঞ্জ ইনাতাবাদ পৌরসভায় ১১ শতক, পুরাতন মুন্সীতে ৮ শতক জমি ও প্রায় ১৫ কাঠার ওপর তৈরি দুটি বাড়ি রয়েছে। এছাড়া ঢাকার মতিঝিল ও উত্তরায় একাধিক ফ্ল্যাট, নিজ গ্রামে বিশাল অট্টালিকা ও বিলাসবহুল গাড়ি ছাড়াও দুবাইয়ে বিলাসবহুল বাংলো, সুপারশপ, হোটেল ও ক্যাসিনো ব্যবসায় রুবেলের বিনিয়োগের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সাবরেজিস্ট্রি অফিসের কর্মচারীরা জানান, এসব সম্পত্তির রেজিস্ট্রি ও বাজারমূল্যের তথ্য কর্তৃপক্ষ চাইলে লিখিতভাবে দেওয়া হবে, তবে বাজার দর হিসাব করলে তা শতকোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। পল্টন থানার মামলায় রুবেল ছাড়া অন্যান্য আসামিরা হলেন—রাজধানীর উত্তর বাড্ডার মো. ইকবাল আশরাফ ওরফে ক্যাসিনো ইকবাল, গাজীপুরের তাসনুভা নওরিন সানজানা ওরফে শারমিন জাহান তিশা, কুমিল্লার দেবিদ্বারের জুয়েল রানা, চুয়াডাঙ্গার মো. সুজন, হবিগঞ্জের সুলতানশী গ্রামের ময়নুল হাসানসহ অজ্ঞাতনামা ৫/৬ জন। এদের মধ্যে ময়নুল হাসান ওরফে দুলাল স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন এবং অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটরের পদ বাগিয়ে নিয়েছিলেন। সম্প্রতি আইন মন্ত্রণালয় তার নিয়োগ বাতিল করেছে এবং তিনি পুলিশের খাতায় পলাতক রয়েছেন। এছাড়া রুবেলের ভাই মো. সোহাগ মিয়া ওরফে ‘মাদক্কা ক্যাসিনো সোহাগ’ দুবাইয়ে অবস্থান করে অনলাইন জুয়া, অর্থ পাচার ও মাদক চোরাচালান চক্রের মূল সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রুবেল তৎকালীন এমপি আবু জাহিরের অর্থ জোগানদাতা ছিলেন এবং নিজের পরিচয় দিতেন যুবলীগ নেতা হিসেবে। জুলাই আন্দোলনের হত্যা মামলাতেও তার নাম রয়েছে। এ বিষয়ে হবিগঞ্জ সদর আসনের সংসদ সদস্য ও হুইপ জিকে গউছ বলেন, রুবেল বিগত আওয়ামী লীগ এমপির প্রশ্রয়েই এসব অপকর্ম চালিয়ে আসছিলেন, যা হবিগঞ্জের সবার জানা। বর্তমান সরকারের আমলে কোনো অপরাধী পার পাবে না এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে যেকোনো দলের অপরাধীকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দলীয় পরিচয় নিয়ে ময়নুল হাসান ওরফে দুলালের বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করেন, কোনো ব্যক্তির অপরাধের দায় দল নেবে না এবং তার বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। SHARES অন্যান্য বিষয়: অনলাইন জুয়াঅর্থ পাচারক্যাসিনো রুবেলডিজিটাল প্রতারণাডিবি পুলিশহবিগঞ্জ