নতুন পে-স্কেলে সরকারি বেতন বৃদ্ধি, বেসরকারি খাতে তৈরি হচ্ছে বড় চ্যালেঞ্জ প্রকাশিত: ১০:৪০ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬ সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন জাতীয় বেতনস্কেল চালুর পর দেশের বেসরকারি খাতে বেতন ও মজুরি সমন্বয়ের বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে যাচ্ছে। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সরকারি পে-স্কেলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বড় পরিসরে বেতন বাড়ানোর সক্ষমতা অধিকাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নেই। এর ফলে সরকারি ও বেসরকারি খাতের বেতনের ব্যবধান বৃদ্ধি, দক্ষ কর্মী ধরে রাখা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে মজুরি সমন্বয়ের ক্ষেত্রে ত্রিমুখী সংকটের মুখোমুখি হতে পারে বেসরকারি খাত। অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারি পে-স্কেল বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য বাধ্যতামূলক না হলেও, সরকারি চাকরিতে বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লে একই যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মীদের মধ্যে একটি তুলনামূলক আলোচনা তৈরি হয়। বিশেষ করে দক্ষ কর্মীদের ধরে রাখতে কিছু প্রতিষ্ঠানকে তাদের বেতন-ভাতা পুনর্বিন্যাস করতে হতে পারে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম জানান, সাধারণত সরকারি পে-স্কেল পুনর্নির্ধারণ করা হলে বেসরকারি খাতেও এর একটি পরোক্ষ চাপ তৈরি হয় এবং পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব উদ্যোগে মজুরি বা বেতন কাঠামো পুনর্বিন্যাস করে। তবে এবার সরকারি কর্মচারীদের বেতন যে মাত্রায় বাড়ানো হয়েছে, তা বেসরকারি খাতের পক্ষে হুবহু অনুসরণ করা বেশ কঠিন। নতুন পে-স্কেলে সরকারি কর্মচারীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, দীর্ঘ সময় পর নিচের গ্রেডগুলোতে বেতন বাড়ানোর যৌক্তিকতা থাকলেও ওপরের গ্রেডগুলোতে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধি কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এই বিশাল অঙ্কের বেতন বৃদ্ধিকে বিবেচনায় নিয়ে বেসরকারি খাতের পক্ষে এখনই একইভাবে পে-স্কেল সংশোধন করার সক্ষমতা আছে বলে মনে হয় না। তবে নতুন বেতনস্কেলের পুরো কাঠামো অনুসরণ করা সম্ভব না হলেও নিচের গ্রেডের বেতন বেসরকারি খাতের জন্য একটি মানদণ্ড বা বেঞ্চমার্ক হয়ে উঠতে পারে। নতুন কাঠামো অনুযায়ী, ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করা হয়েছে। এছাড়া ৯ম গ্রেডে ২২ হাজার টাকা থেকে মূল বেতন বেড়ে ৪৪ হাজার টাকা এবং ১০ম গ্রেডে ১৬ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৩২ হাজার টাকা হয়েছে। সিপিডির এই অর্থনীতিবিদ মনে করেন, বিশেষ করে ২০তম গ্রেডে মূল বেতন ২০ হাজার টাকা নির্ধারণের বিষয়টি বেসরকারি খাতের নিম্ন আয়ের কর্মীদের মজুরি পুনর্নির্ধারণের ক্ষেত্রে একটি বেঞ্চমার্ক হতে পারে। এই মানদণ্ড বিবেচনা করে বেসরকারি খাতের কর্মী ও শ্রমিকেরা মজুরি পুনর্বিন্যাসের জন্য মজুরি বোর্ডের কাছেও দাবি জানাতে পারেন। দেশের শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি বর্তমানে তুলনামূলকভাবে সীমিত এবং নতুন বিনিয়োগও কম হচ্ছে। একই সঙ্গে রপ্তানি বাজারের পরিস্থিতিও অনিশ্চিত। এমন অবস্থায় সরকারি পে-স্কেল পুরোপুরি অনুসরণ করে বেসরকারি খাতে বেতন বাড়ানো কঠিন। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বেতন বাড়ানো মানে শুধু কর্মীর হাতে বাড়তি অর্থ দেওয়া নয়; এর সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের মোট শ্রমব্যয়, কর্মী-সুবিধা, নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়। ফলে বেতন সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিতে হলে প্রতিষ্ঠানকে উৎপাদনশীলতা, মুনাফা, বাজারের প্রতিযোগিতা ও পণ্যের দাম—সবকিছু বিবেচনায় নিতে হয়। এই কারণে বড় ও লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলো দক্ষ কর্মী ধরে রাখতে বেতন ও অন্যান্য সুবিধা বাড়াতে পারলেও ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে তা করা কঠিন হতে পারে। ফলে নতুন পে-স্কেলের প্রভাব বেসরকারি খাতে প্রতিষ্ঠান ও খাতভেদে ভিন্ন হবে। সরকারি চাকরিতে বেতন-ভাতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায় ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল, হিসাবরক্ষণ, স্বাস্থ্যসেবা ও ব্যবস্থাপনার মতো দক্ষতাভিত্তিক পেশায় কর্মরতরা বিভিন্ন চাকরির সুযোগ তুলনা করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে শুধু মূল বেতন নয়, বোনাস, স্বাস্থ্যসুবিধা, অবসর সুবিধা, কর্মঘণ্টা, পদোন্নতি ও চাকরির নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যদি মজুরি সমন্বয় না করে, তাহলে দক্ষ কর্মী ধরে রাখা চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে, যার প্রভাব উৎপাদন খাতেও পড়তে পারে। তবে দেশে নতুন কর্মসংস্থান তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় শুধু মজুরি না বাড়ানোর কারণে কর্মীরা ব্যাপকভাবে চাকরি ছেড়ে দেবেন—এমন পরিস্থিতি এখন নেই। বরং অনেক কর্মীর জন্য বর্তমান চাকরি ধরে রাখাই প্রধান বিষয়। দীর্ঘ সময় ধরে চলা উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বেসরকারি কর্মীদের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে। ফলে সরকারি পে-স্কেলের প্রভাবের বাইরে থেকেও বেসরকারি খাতে মজুরি সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে। ফরমাল খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোতে সাধারণত প্রতিবছর মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করে ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটি পর্যাপ্ত নয়। অনেক ক্ষেত্রে শুধু বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট নয়, পুরো বেতন কাঠামোই পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন হতে পারে। সরকারি নতুন জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ মূলত সরকারি চাকরির জন্য প্রযোজ্য। গত ১৭ সেপ্টেম্বর জারি করা ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’ অনুযায়ী, ১ জুলাই ২০২৬ থেকে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হয়েছে। তবে বাড়তি বেতনের পুরো অর্থ একবারে দেওয়া হচ্ছে না। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৯ম গ্রেড ও তদূর্ধ্ব গ্রেডে বেতনবৃদ্ধির পার্থক্যের ৪০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডে ৫০ শতাংশ দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত তা যথাক্রমে ৭০ ও ৭৫ শতাংশ হবে। এরপর ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে বার্ষিক বেতনবৃদ্ধিসহ পূর্ণ বেতন দেওয়ার কথা রয়েছে। যেহেতু এই বেতনস্কেল বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য বাধ্যতামূলক নয়, তাই বেসরকারি চাকরিজীবীদের বেতন স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোনো নির্দিষ্ট হারে বাড়বে না। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা, উৎপাদনশীলতা, শিল্পের ধরন, দক্ষতার চাহিদা এবং শ্রমবাজারের পরিস্থিতিই মূলত বেতন নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে। তবে সরকারি কর্মচারীদের আয় বাড়ার ফলে তাদের ভোগব্যয় বাড়তে পারে, যা পণ্য ও সেবার চাহিদায় পরিবর্তন আনতে পারে। বাড়তি চাহিদার সঙ্গে সরবরাহ সমান হারে না বাড়লে কিছু পণ্য ও সেবার দামে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা বেসরকারি চাকরিজীবীদের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতার ওপর পরোক্ষ প্রভাব ফেলতে পারে। SHARES অন্যান্য বিষয়: খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমজাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬বেতন বৃদ্ধিবেসরকারি খাতমূল্যস্ফীতিসিপিডি