মার্কিন সিনেটে প্রথম মুসলিম সায়েদের ইতিহাস, মিশিগানে বিজয়ী

প্রকাশিত: ৮:১১ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ৭, ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাট দলীয় প্রার্থী ড. আবদুল এল-সায়েদ মিশিগান অঙ্গরাজ্য থেকে মার্কিন সিনেটে নির্বাচিত হয়ে এক অনন্য ইতিহাস গড়েছেন। গত ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে তিনি ৫২ শতাংশ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্স পান ৪৬ শতাংশ ভোট। এই ঐতিহাসিক জয়ের মাধ্যমে এল-সায়েদ দেশটির সিনেটে নির্বাচিত প্রথম মুসলিম-আমেরিকান এবং এ পর্যন্ত সিনেট আসন অর্জন করা ষষ্ঠ আরব-আমেরিকান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেন। তার এই সাফল্য ডেমোক্র্যাটদের বিস্তৃত নির্বাচনী বিজয়েরই অংশ, যার মাধ্যমে দলটি মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেয়। (প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:০৮ পিএম / 07 Nov 2026, 07:08 PM)।

আবদুল এল-সায়েদের এই জয় কেবল এক সাধারণ নির্বাচনী সাফল্য নয়; মিশিগান, সামগ্রিক মার্কিন রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এর সুদূরপ্রসারী সামাজিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্যে জয়ী হয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, শক্তিশালী ইসরাইলপন্থি লবির বিরোধিতা করা কিংবা ফিলিস্তিনিদের পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া রাজনৈতিক পরাজয়ের কারণ নয়। বরং ফিলিস্তিনের প্রতি তার এই সুদৃঢ় অবস্থানই নির্বাচনে মূল বিজয়ের অন্যতম শক্তি হিসেবে কাজ করেছে।

নির্বাচনী প্রচারণার পুরোটা সময় জুড়ে এল-সায়েদকে বারবার প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে তিনি ইসরাইলের 'অস্তিত্বের অধিকার' স্বীকার করেন কিনা। জবাবে তার সুস্পষ্ট অবস্থান ছিল, ফিলিস্তিনিদের নিজেদের মাতৃভূমিতে স্বাধীনভাবে, সমান মর্যাদায় এবং নিরাপত্তার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে এবং এই মৌলিক অধিকারের বিষয়ে কোনো আপস করা সম্ভব নয়। গত সেপ্টেম্বর মাসে মিশিগানের একদল রাব্বি, ক্যান্টর ও ইহুদি সম্প্রদায়ের নেতা জিওনেস অ্যাকশন ফান্ডের সহায়তায় 'নননেগোশিয়েবল মিশিগান' নামে একটি প্রচারণা শুরু করেছিলেন। সেখানে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের কাছে ইহুদিদের নিরাপত্তা, নিজেদের পরিচয় নির্ধারণের অধিকার, ইসরায়েলে ইহুদিদের সার্বভৌমত্ব এবং মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে একটি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিসহ পাঁচটি বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দাবি করা হয়। এটি মূলত হতাশ জায়নবাদীদের এমন একটি কৌশল ছিল, যার মাধ্যমে ইসরাইলকেন্দ্রিক এজেন্ডাকে ইহুদি ভোটারদের নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের ওপর চাপ তৈরি করার চেষ্টা হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের ইহুদি নাগরিকদের নিজেদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিতের যে কোনো দাবির প্রতি ড. আবদুল এল-সায়েদ সবসময়ই সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তবে যারা ইসরাইলের সমালোচনাকে সরাসরি ইহুদিবিদ্বেষ হিসেবে আখ্যা দিয়ে দেশটির ঔপনিবেশিক বসতি স্থাপনকে জবাবদিহির বাইরে রাখতে চেয়েছেন, তাদের সন্তুষ্ট করার কোনো পথ এল-সায়েদের কাছে ছিল না। কারণ তার নীতিগত অবস্থান ছিল স্পষ্ট—ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা, ভূখণ্ড দখল ও মানবাধিকার হরণকারী কোনো সহিংস বর্ণবাদী কাঠামোর টিকে থাকার অন্যায্য অধিকার থাকতে পারে না। কোনো রাষ্ট্রই আন্তর্জাতিক নিয়ম ভঙ্গ করে গণনৃশংসতার মাধ্যমে আধিপত্য ধরে রাখতে পারে না।

এই নির্বাচন ছিল সায়েদের জন্য মারাত্মক বর্ণ ও ধর্মবিদ্বেষের বিরুদ্ধে লড়াইয়েরও এক ময়দান। প্রতিপক্ষ মাইক রজার্স ও তার সমর্থকেরা মাসের পর মাস ধরে এল-সায়েদের আরব ও মুসলিম পরিচয়কে মূল রাজনৈতিক দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করার অপচেষ্টা চালান। তার বিরুদ্ধে হামাস, হিজবুল্লাহ এবং মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে যোগাযোগের ভিত্তিহীন অভিযোগ আনা হয়। এমনকি তিনি ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলায় সমর্থন দেন কিংবা যুক্তরাষ্ট্রে শরিয়াহ আইন চালু করতে চান—এমন নানাবিধ বিভ্রান্তিকর প্রচারণা ছড়িয়ে তাকে বিপজ্জনক ও মার্কিন মূল্যবোধবিরোধী হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হয়। এসব কুৎসাকে ভুল প্রমাণ করে বিজয়ী হওয়ার পর নবনির্বাচিত সিনেটর আবদুল এল-সায়েদ সংক্ষেপে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, 'খারাপ লোকেরাই হেরেছে।'

এল-সায়েদের এই জয় ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভেতরের একটি পুরোনো রাজনৈতিক অজুহাতকে বড় ধাক্কা দিয়েছে। দলের নীতিনির্ধারকেরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছিলেন যে প্রগতিশীল প্রার্থীরা সাধারণ নির্বাচনে জেতার মতো শক্ত প্রার্থী নন। এই যুক্তিতে তারা বারবার প্রগতিশীল প্রার্থীদের কোণঠাসা করেছেন এবং দলীয় প্রাইমারিতে সায়েদের বিরুদ্ধেও প্রধান তর্ক ছিল, মিশিগানের মতো দোদুল্যমান রাজ্যে তিনি 'অতিরিক্ত প্রগতিশীল' হওয়ায় জিততে পারবেন না। অর্থাৎ ইসরাইলের মানবাধিকার লঙ্ঘনে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ ও সমর্থন বন্ধের দাবি নীতিগতভাবে সঠিক হলেও বড় ধরনের রাজনৈতিক স্বার্থ ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কায় তা এড়িয়ে চলার দলীয় প্রবণতা ছিল।

২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের উদাহরণ টেনে এই নীতির ব্যর্থতা তুলে ধরা যায়। ইনস্ট্রিটিউট ফর মিডল ইস্ট আন্ডারস্ট্যান্ডিং (আইএমইইউ) ও ইউগভের জনমত জরিপে দেখা গিয়েছিল, ইসরাইলে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধের পক্ষে অবস্থান নিলে কমলা হ্যারিস যে পরিমাণ ভোট হারাতে পারেন, তার চেয়ে ৫ থেকে ৭ গুণ বেশি ভোট তিনি পেতে পারতেন। ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল কনভেনশনে হ্যারিস ক্যাম্পের কাছে এই তথ্য পৌঁছে দেওয়া হলেও তারা ভোটারদের এই বাস্তব উদ্বেগকে উপেক্ষা করে অর্থদাতা ও ভেতরের প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর স্বার্থ রক্ষা করেছিল। যার ফলে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে গভীর রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। সব বাধা পেরিয়ে সায়েদের এই বিশাল জয় প্রমাণ করল, ফিলিস্তিনের পক্ষে দাঁড়ানো এখন আর মার্কিন রাজনীতিতে কোনো বাধা নয়, বরং জনসমর্থন পাওয়ার অন্যতম বড় হাতিয়ার।