পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় ইসলামের অনন্য নির্দেশনা

প্রকাশিত: ১০:৩৩ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২, ২০২৬

একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে বিভিন্ন জীবের সহাবস্থান এবং তাদের মধ্যে জীনগত, প্রজাতিগত ও বাস্তুতান্ত্রিক বৈচিত্র্যকে জীববৈচিত্র্য বলা হয়। জীববিজ্ঞানী ম্যাকেঞ্জির মতে, বিভিন্ন বাস্তুতন্ত্রের বিভিন্ন স্তরের জীবদের একই প্রজাতির জীনগত প্রকরণ থেকে শুরু করে নানা প্রজাতির বৈচিত্র্যই হলো জীববৈচিত্র্য। প্রকৃতির এই বৈচিত্র্যময়তা মহান আল্লাহতায়ালার এক বিশেষ সৃষ্টি ও নির্ধারণ। পবিত্র কোরআনের সুরা শুরার ২৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তাঁর নিদর্শনাবলির একটি হলো, আসমান ও জমিন এবং এর মধ্যে বিস্তৃত জীবজন্তুর সৃষ্টি। নিশ্চয়ই তিনি চাইলেই সবকিছু একত্রিত করতে সক্ষম।’

পৃথিবীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে হলে কোরআন ও সুন্নাহর নির্দেশিত পথ অনুসরণ করে উদ্ভিদ ও প্রাণিজ সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। পরিবেশকে মানুষের তৈরি ক্ষতিকর কৃত্রিম নিয়ম ও অনিষ্ট থেকে মুক্ত রাখতে পারলে জীববৈচিত্র্য স্বাভাবিক থাকবে। গ্রিন হাউস ইফেক্ট বা পরিবেশের মারাত্মক বিপর্যয় এড়াতে প্রকৃতিকে তার আদি ও নিজস্ব রূপে টিকিয়ে রাখা আবশ্যক। মানুষ যদি আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামতের অপব্যবহার করে প্রকৃতির ক্ষতিসাধন করে, তবে পরিবেশও মানুষের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে। সুরা রুমের ৪১ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা সতর্ক করে বলেছেন, ‘জলে-স্থলের সব বিপদ মানুষের হাতের কামাই। যাতে তারা তাদের কৃতকর্মের কুফল ভোগ করে এবং তা থেকে ফিরে আসে।’

প্রকৃতির ভারসাম্য ধরে রাখতে গাছপালা, বনাঞ্চল, জলবায়ু এবং পশুপাখির যথাযথ সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। রাসুলুল্লাহ (সা.) পরিবেশ রক্ষায় যে সুদূরপ্রসারী নির্দেশনা দিয়েছেন, তা সব যুগের জন্যই সমানভাবে কার্যকর। তিনি বনাঞ্চল বৃদ্ধি ও বৃক্ষরোপণের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। উমদাতুল কারি (১২/১৫৪) গ্রন্থের এক হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যদি কারও হাতে রোপণ করার কোনো চারা থাকে, এমতাবস্থায় কেয়ামত এসেও যায় এবং রোপণ করার সময় পাওয়া যায়, তাহলে তা রোপণ করা ছাড়া সে যেন দাঁড়িয়ে না থাকে।’ অন্য একটি হাদিসে (উমদাতুল কারি: ১২/১৫৫) বৃক্ষরোপণকে সদকায়ে জারিয়া বা চলমান সওয়াবের কাজ হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, অন্যায়-জুলুম না করে কোনো ঘর নির্মাণ বা চারা রোপণ করলে, তা থেকে আল্লাহর সৃষ্টি যতদিন উপকৃত হবে, রোপণকারী ততদিন সওয়াব পেতে থাকবেন।

পরিবেশ ও প্রাণিজগৎকে সতেজ রাখতে উদ্ভিদের ভূমিকা অপরিসীম। উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের মতে, একটি দেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে মোট ভূখণ্ডের অন্তত ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা আবশ্যক। পর্যাপ্ত বনাঞ্চল না থাকাই পরিবেশ বিপর্যয়ের অন্যতম বড় কারণ। রাসুল (সা.) একদিকে যেমন বৃক্ষরোপণের তাগিদ দিয়েছেন, অন্যদিকে অকারণে গাছ কাটা বা বন উজাড়ের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। এমনকি যুদ্ধের ময়দানেও খেজুরগাছ বা অন্য কোনো উদ্ভিদ কাটতে নিষেধ করেছেন তিনি (এরশাদুল ফকিহ: ২/৩২০)।

জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ দূষণ রোধে পানির অপচয় ও দূষণ রোধ করা অত্যন্ত জরুরি। রাসুল (সা.) পানির অপচয় রোধে অত্যন্ত কঠোর ছিলেন। একবার হজরত সাদ (রা.) অজু করার সময় অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করছিলেন। রাসুল (সা.) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘সাদ! পানির অপচয় করছ কেন?’ সাদ (রা.) অবাক হয়ে জানতে চাইলেন, ‘অজু করার ক্ষেত্রেও কি অপচয় হয়?’ রাসুল (সা.) উত্তর দিলেন, ‘অবশ্যই। এমনকি তুমি যদি বহমান নদী বা সাগরে বসেও অজু করো, তাহলেও অতিরিক্ত পানি ব্যবহার অপচয় হিসেবে গণ্য হবে’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪১৯)।

যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগ করা পরিবেশ ও জলবায়ু দূষণের অন্যতম কারণ। এ কারণে রাসুল (সা.) মানুষের চলাচলের পথ, ছায়াদার গাছের নিচে এবং স্থির পানিতে মলমূত্র ত্যাগ করতে নিষেধ করেছেন। হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) সাহাবিদের অভিশপ্ত দুটি কাজ থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেন। তারা জানতে চাইলে রাসুল (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি মানুষের চলাচলের রাস্তায় বা তাদের বিশ্রামের ছায়াযুক্ত স্থানে মলমূত্র ত্যাগ করে, সে অভিশপ্ত (মুসলিম: ১/১৮৮)। অন্য একটি হাদিসে স্থির পানিতে প্রস্রাব করতেও নিষেধ করা হয়েছে (মুসলিম: ১/৭৩)।

পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা সুস্থ জীবনের জন্য অপরিহার্য। ঘরবাড়ি ও চারপাশ নোংরা রাখার কারণে পৃথিবীর অনেক স্থান আজ বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। এ বিষয়ে রাসুল (সা.) নির্দেশনা দিয়ে বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের আঙিনা পরিষ্কার রাখো, ইহুদিরা তাদের বসবাসস্থলের চারপাশ অপরিচ্ছন্ন রাখে’ (তাবারানি: ২/১১)। এছাড়া জীবজন্তুও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে। অহেতুক প্রাণী হত্যা প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মকে ব্যাহত করে। রাসুল (সা.) অকারণে কোনো প্রাণী হত্যা করতে নিষেধ করে বলেছেন, ‘কেউ যদি চড়ুই পাখি বা তার চেয়ে ছোট কোনো প্রাণীকেও অকারণে হত্যা করে, কেয়ামতের দিন তাকে জবাবদিহিতা করতে হবে’ (মিরকাত: ২৬৫৮)।