রাজধানীতে ছিনতাইয়ের প্রকৃত চিত্র আড়ালে, পুলিশের খাতায় নেই অনেক ঘটনা প্রকাশিত: ১০:৩২ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২, ২০২৬ রাজধানীতে ছিনতাইয়ের ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটলেও এর প্রকৃত চিত্র পুলিশের অপরাধের খাতায় সঠিকভাবে উঠে আসছে না। ভুক্তভোগীদের একটি বড় অংশ থানায় গিয়ে মামলা করতে পারছেন না, আবার কেউ কেউ মামলা করতে চাইলেও পুলিশ অনেক ক্ষেত্রে ছিনতাইয়ের পরিবর্তে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) গ্রহণ করছে। ফলে সরকারি পরিসংখ্যানে ছিনতাইয়ের যে সংখ্যা দেখা যায়, তা বাস্তবের তুলনায় অনেক কম। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে ছিনতাইয়ের ১ হাজার ৬৭টি মামলা হয়েছে, যার মধ্যে ঢাকা রেঞ্জ ও ডিএমপি এলাকায় মামলার সংখ্যা ৪৪৩টি। ডিএমপির ৫০ থানায় মামলা হয়েছে ১৮৯টি। তবে এই সংখ্যা কেবল নথিভুক্ত মামলার হিসাব, যা প্রকৃত ভুক্তভোগীদের সংখ্যার পূর্ণ চিত্র নয়। অনুসন্ধানে দেখা যায়, পথচারী, রিকশার যাত্রী, ব্যবসায়ী, ব্যাংকার থেকে শুরু করে নগদ টাকা বহনকারী কর্মীরা পর্যন্ত ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন, কিন্তু তাদের বড় একটি অংশ আইনি প্রক্রিয়ায় যেতে অনাগ্রহী। ছিনতাইয়ের ঘটনাকে জিডিতে সীমাবদ্ধ করার উদাহরণ হিসেবে ১১ মে মোহাম্মদপুরের চাঁন মিয়া হাউজিংয়ের ঘটনার কথা উল্লেখ করা যায়। সিসিটিভি ক্যামেরায় অস্ত্রের মুখে এক কলেজছাত্রের মোবাইল ও টাকা ছিনতাইয়ের দৃশ্য ধরা পড়লেও ভুক্তভোগীর বাবা মামলা করতে গেলে পুলিশ তাকে মুঠোফোন হারানোর জিডি করতে বলে। একইভাবে ১৬ আগস্ট মৌচাকে নোমান ছিদ্দিক ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে গুরুতর আহত হয়েও ছিনতাইয়ের মামলা করতে পারেননি, বরং তাকে জিডি করতে হয়েছে। ভুক্তভোগীদের অনেকের মতে, মামলা বা জিডি করেও মালামাল ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বলেই অনেকে থানায় যেতে চান না, যেমনটি ঘটেছে জুনে মোহাম্মদপুর নবীনগর হাউজিংয়ের ইমতিয়াজ ও সাদমানের ক্ষেত্রে। ছিনতাইয়ের ঘটনা এখন আর কেবল রাতের অপরাধ নয়। গত ছয় মাসের ২৩টি আলোচিত ঘটনার মধ্যে ৬৫ শতাংশই ঘটেছে ভোররাত থেকে সকাল ৯টা এবং সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১২টার মধ্যে। চলন্ত রিকশা বা অটোরিকশা থেকে ব্যাগ টানার মতো পরিচিত দৃশ্য এখন প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। ৬ জুন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে রিকশা থেকে পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পাওয়া সোহেলি ইসলাম ১১ জুন মারা যান। একই ধরনের ঘটনায় ২৯ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে রনজিলা পারভীন নামে এক শিক্ষিকার মৃত্যু হয়। এর আগে মুক্তা আক্তার নামে আরেকজন একই কায়দায় প্রাণ হারিয়েছেন। ছিনতাইকারীদের টার্গেটে এখন নগদ টাকা বহনকারী ব্যক্তিরাও রয়েছেন। উত্তরা এলাকায় ১০ আগস্ট পেট্রলপাম্পের ১ কোটি ২১ লাখ ২৫ হাজার টাকা এবং ধানমন্ডি লেক এলাকায় ৩১ আগস্ট এক সৌদি প্রবাসীর ৩৯ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় পুলিশ অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করেছে। পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানান, সারা দেশে ছিনতাইকারীদের তালিকা করা হয়েছে এবং প্রতিটি ইউনিটকে অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ ওসমান গণি বলেন, দায়িত্বে গাফিলতির সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে চেকপোস্ট ও নিয়মিত টহল অব্যাহত রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, পুলিশের পরিসংখ্যানের বাইরে ছিনতাইয়ের একটি বড় বাস্তবতা থেকে যাচ্ছে। তিনি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে পুলিশি টহল জোরদার, ভুক্তভোগীর অভিযোগ সহজে গ্রহণ এবং ছিনতাইয়ের ঘটনা যথাযথ ধারায় নথিভুক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তার মতে, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বিশ্লেষণ করে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি, অন্যথায় পুলিশের পরিসংখ্যান ও বাস্তব পরিস্থিতির পার্থক্য থেকেই যাবে। SHARES অন্যান্য বিষয়: অপরাধছিনতাইজিডিঢাকা পুলিশনিরাপত্তা