বন্যায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত, বাংলাদেশে রপ্তানি স্থগিত করল নেপাল

প্রকাশিত: ১১:০১ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৩, ২০২৬

প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও ভারী বর্ষণে সৃষ্ট বন্যার কবলে পড়েছে নেপাল। বর্ষা মৌসুমে সাধারণত দেশটি উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করে প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে বিক্রি করে থাকে, কিন্তু এবার প্রাকৃতিক কারণে তাদের বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নেপাল সাময়িকভাবে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রপ্তানি স্থগিত করেছে। ভারী বৃষ্টিতে নদীগুলো ফুলে ফেঁপে ওঠায় নদীপ্রবাহভিত্তিক জলবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

গত ২৬শে আগস্ট ভোতেকোশি নদী ব্যবস্থায় ভয়াবহ বন্যার পর নেপালের বেশ কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে দেশটির বিদ্যুৎ রপ্তানির পরিমাণ ১ হাজার মেগাওয়াট থেকে কমে প্রায় ৬৫০ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য অনুমোদিত ২২ দশমিক ১ মেগাওয়াটের চিলিমে এবং ২৪ মেগাওয়াটের ত্রিশূলি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প দুটিও এই বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত সপ্তাহ থেকে প্রকল্প দুটির উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। চিলিমে প্রকল্প থেকে ভারতে ২১ দশমিক ৪ মেগাওয়াট এবং ত্রিশূলি প্রকল্প থেকে ১৮ দশমিক ৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বিক্রির অনুমোদন ছিল, যা ভারতের মাধ্যমে বাংলাদেশে পাঠানোর অনুমতি দেয়া হয়েছিল। নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক দীর্ঘায়ু কুমার শ্রেষ্ঠা জানিয়েছেন, বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী দুটি প্রকল্পই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বর্তমানে বিদ্যুৎ রপ্তানি কার্যত শূন্য। তারা বিকল্প হিসেবে অন্য প্রকল্পের বিদ্যুৎ পাঠানোর জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন।

বন্যায় মোট ১২টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। সানজেন, আপার সানজেন ও সালাসুঙ্গি প্রকল্পকে ‘আইসোলেটেড মোডে’ রাখা হয়েছে, কারণ এসব প্রকল্পের সঞ্চালন লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর অর্থ হলো, কেন্দ্রগুলো জাতীয় গ্রিডের বাইরে থেকে কেবল স্থানীয় চাহিদা মেটাচ্ছে। বিদ্যুৎ আমদানি ও রপ্তানির অনুমোদন দেয় ভারতের সেন্ট্রাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটি। এ পর্যন্ত নেপালের ৩৭টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে বিদ্যুৎ রপ্তানির অনুমোদন দিয়েছে ভারত, যার সম্মিলিত উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট।

রপ্তানি কমে যাওয়ার কারণ শুধু বন্যা নয়। ভারতের অনুমোদন নবায়ন না হওয়ায় আরও তিনটি প্রকল্পের ৭৩ দশমিক ৭৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ভারতে রপ্তানি করা সম্ভব হচ্ছে না। এর মধ্যে ৩৮ দশমিক ৮ মেগাওয়াটের আপার চামেলিয়া প্রকল্পের অনুমোদন ৩১শে জুন এবং ২৪ দশমিক ২৫ মেগাওয়াটের সেটি রিভার ও ১০ দশমিক ৭০ মেগাওয়াটের আপার তাদি খোলা প্রকল্পের অনুমোদন ৩১শে জুলাই শেষ হয়েছে।

দুই দেশের মধ্যে বিদ্যুৎ বাণিজ্যের জন্য ৪০০ কেভি ধলকেবার-মুজাফফরপুর লাইন এবং ১৩২ কেভি তানাকপুর-মহেন্দ্রনগর, কাটাইয়া-কুশাহা, রক্সৌল-পারওয়ানিপুর, গান্দাক-রামনগর ও মাইনাহিয়া-সম্পাতিয়া লাইন রয়েছে। বাংলাদেশের বাজারে বিদ্যুৎ রপ্তানির ক্ষেত্রে আরও জটিলতা রয়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে নেপাল-বাংলাদেশ জ্বালানি সচিব পর্যায়ের জয়েন্ট স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠকে বিদ্যমান ৪০ মেগাওয়াটের সাথে আরও ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানির বিষয়ে দুই দেশ সম্মত হলেও ভারত সঞ্চালন সক্ষমতার ঘাটতির কারণ দেখিয়ে তা নাকচ করে দেয়। এছাড়া, চীনা বিনিয়োগ বা ঠিকাদার জড়িত প্রকল্পগুলোর বিদ্যুৎ রপ্তানির অনুমোদন দিতেও ভারত অনীহা দেখাচ্ছে, যার উদাহরণ ৪৫৬ মেগাওয়াটের আপার তামাকোশি প্রকল্প।

সাবেক জ্বালানিমন্ত্রী কুলমান ঘিসিং বলেন, বিদ্যুৎ রপ্তানির অনুমোদন নিশ্চিত ও নবায়নের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। ২০২১ সালে বিদ্যুৎ রপ্তানি শুরু করার পর এটিই নেপালের জন্য বড় সংকট। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নেপাল ভারত ও বাংলাদেশে ২৯ দশমিক ৩২ বিলিয়ন নেপালি রুপি মূল্যের বিদ্যুৎ রপ্তানি করেছে, যেখানে শুষ্ক মৌসুমে ভারত থেকে ১০ দশমিক ২৩ বিলিয়ন রুপির বিদ্যুৎ আমদানি করেছে দেশটি। নেপাল এখন ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।