গুলশানে আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল ও ককটেল বিস্ফোরণ, ডিসি-ওসি প্রত্যাহার

প্রকাশিত: ১২:৩৯ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬

রাষ্ট্রের অন্যতম সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বলয় ও কূটনৈতিক জোন হিসেবে পরিচিত রাজধানীর গুলশানে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এই নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনার পর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) এম তানভীর আহমেদ এবং গুলশান মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. দাউদ হোসেনকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই আকস্মিক প্রশাসনিক পদক্ষেপের পর পুরো ডিএমপির ডিসি, এসি এবং ওসিসহ বিভিন্ন স্তরের পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে বদলি বা ক্লোজড হওয়ার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর থেকেও ইতিমধ্যে কঠোর বার্তা দিয়ে জানানো হয়েছে যে, নিষিদ্ধ দলের কার্যক্রম ঠেকাতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট জোনের পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদের সই করা পৃথক দুটি আদেশে এই প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত জানানো হয়। আদেশে বলা হয়, প্রশাসনিক কারণে গুলশান বিভাগের ডিসি এম তানভীর আহমেদকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ডিএমপি সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে এবং তাকে পরবর্তী জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার কাছে দায়িত্ব অর্পণ করতে বলা হয়েছে। একই সাথে গুলশান থানার ওসি মো. দাউদ হোসেনকে প্রত্যাহারের আদেশে বলা হয়, প্রশাসনিক কারণে ১৬ সেপ্টেম্বর পূর্বাহ্নে তাকে ডিএমপি সদর দপ্তর ও প্রশাসন বিভাগের কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ দপ্তরে সংযুক্ত (ক্লোজড) করা হলো। এর আগে গত শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) গুলশানে মিছিলের পর ওসির বদলির একটি খবর ছড়ালেও সে সময় পুলিশ তা ভুয়া বলে দাবি করেছিল। তবে ঘটনার এক সপ্তাহ পার হওয়ার আগেই তাকে শেষ পর্যন্ত সরিয়ে দেওয়া হলো।

ঘটনার বিবরণী থেকে জানা যায়, গত ১১ সেপ্টেম্বর দুপুর পৌনে ১২টার দিকে গুলশান থানার ৩ নম্বর সড়কের কেএফসি সংলগ্ন এলাকায় এবং গুলশান-১ এর ভোলা মসজিদের সামনে থেকে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের প্রায় দুই শতাধিক নেতাকর্মী একটি ঝটিকা মিছিল বের করার চেষ্টা করে। পুলিশ মিছিলটি ছত্রভঙ্গ করতে গেলে মিছিলকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ককটেল নিক্ষেপ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ শটগানের দুই রাউন্ড গুলি ছোড়ে। ঘটনাস্থল থেকে হাতেনাতে দুজনকে গ্রেফতার এবং পাঁচটি অবিস্ফোরিত ককটেল উদ্ধার করা হয়। পরবর্তীতে রাতভর বিশেষ অভিযান চালিয়ে আরও ৩২ জনসহ এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৭৫ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় ১১৮ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৮০ থেকে ১০০ জনের বিরুদ্ধে ককটেল বিস্ফোরণ ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

অত্যন্ত সুরক্ষিত কূটনৈতিক এলাকা, যেখানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বাসভবন এবং যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, চীন ও রাশিয়ার মতো প্রভাবশালী দেশগুলোর দূতাবাস অবস্থিত, সেখানে কীভাবে এমন একটি মিছিল সম্ভব হলো তা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, গুলশানে মিছিলের বিষয়ে আগে থেকেই গোয়েন্দা তথ্য ছিল। তবে ঠিক ওই সময়ে এবং ওই নির্দিষ্ট স্থানে জুমার নামাজের আগে এমন ঘটনা ঘটতে পারে, তা পুলিশ অনুমান করতে পারেনি। এটিকে গোয়েন্দা বা পুলিশের ব্যর্থতা হিসেবে দেখতে নারাজ মন্ত্রী। তিনি বলেন, পতিত স্বৈরাচারী দলটির নেতাকর্মীরা ফজরের নামাজের পর অল্পসংখ্যক লোক নিয়ে ঝটিকা মিছিল করে ভিডিও ধারণের মতো অপতৎপরতা চালাচ্ছে এবং সরকার এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে।

তবে পুলিশের এই যুক্তি মানতে নারাজ রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক কর্মকর্তারা। সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আবদুল কাইয়ূম বলেন, গুলশান-বনানীর মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সব সংস্থার নিয়মিত তৎপরতা থাকার পরও কীভাবে এত বড় জমায়েত ও বিস্ফোরণ ঘটল, তা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা উচিত। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ে পুলিশ সদস্যদের মনোবল বাড়াতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের তদারকি বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি। অন্যদিকে, রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোবাশ্বার হাসান সিজার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন যে, দেশের গোয়েন্দারা ফাইভ স্টার হোটেল ও সেমিনারে নজরদারি করতে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন যে, প্রধানমন্ত্রীর নিজ এলাকায় নিষিদ্ধ দলের মিছিল নিয়ে তাদের কোনো প্রস্তুতি ছিল না। তিনি এটিকে একটি 'কমেডি' হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

এই মিছিলের ঘটনায় রাজনৈতিক অঙ্গনেও তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম এক ফেসবুক পোস্টে সরাসরি অভিযোগ করে লিখেছেন, 'প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চান বলেই পতিত স্বৈরাচার নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ মিছিল দিতে পারে।' তবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এই ঝটিকা মিছিল নিয়ে আলোচনা হলেও তারা এতে উদ্বিগ্ন নয় বলে জানিয়েছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আওয়ামী লীগের সাথে বিএনপির আঁতাতের অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে বলেন, 'বেআইনি ও আদালত কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো সংগঠন প্রকাশ্যে কোনো কর্মসূচি পালন করতে পারে না। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।' এদিকে, আওয়ামী লীগের মিছিলের প্রতিবাদে গত শুক্রবার রাতেই গুলশানে বিক্ষোভ মিছিল করেছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, যার নেতৃত্ব দেন সংগঠনের সহ-সভাপতি কাজী জিয়াউদ্দিন বাসেত।

আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করছে, আগামী ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার ভারত থেকে দেশে ফেরার ঘোষণার বিষয়টিকে সামনে রেখে মাঠের রাজনীতিতে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে দলটির নেতাকর্মীরা নিয়মিত বিরতিতে এ ধরনের গোপন মিছিল ও জমায়েতের চেষ্টা করছে। গুলশানের ঘটনার পর তারা ভাটারা এলাকায় একটি সভা করার চেষ্টা করলেও স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা তা পণ্ড করে দেন। এর আগে গত বৃহস্পতিবার দুপুরে উত্তরা পশ্চিম থানার আব্দুল্লাহপুর ফ্লাইওভারের নিচ থেকে ব্যানারসহ মিছিলের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় নিষিদ্ধ সংগঠনের চার নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গুলশানের এই ঝটিকা মিছিলকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কেবল একটি বিচ্ছিন্ন কর্মসূচি হিসেবে না দেখে, এর পেছনে গভীর কোনো রাজনৈতিক সমীকরণ বা সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে।