অবসরের সঞ্চয় লুটে নিচ্ছে প্রতারক চক্র, খোয়া গেছে শত কোটি টাকা প্রকাশিত: ৯:০৭ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৩, ২০২৬ চাকরিজীবনের দীর্ঘ পরিশ্রমের পর পাওয়া সঞ্চয়ের টাকা নিরাপদ কোনো খাতে বিনিয়োগ করে বাকি জীবনটা স্বস্তিতে কাটাতে চেয়েছিলেন তারা। কিন্তু সেই স্বপ্নই এখন অনেকের জন্য দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। ফেসবুকের মাধ্যমে অনলাইন বিনিয়োগের প্রলোভন, পরিচিত মানুষের ব্যবসায়িক অংশীদারিত্বের আশ্বাস কিংবা কৃষি প্রকল্পে উচ্চ মুনাফার প্রতিশ্রুতি—প্রতারণার ধরন আলাদা হলেও লক্ষ্য একটাই, অবসরপ্রাপ্তদের শেষ সম্বল হাতিয়ে নেওয়া। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া তিনটি বড় জালিয়াতির ঘটনা বিশ্লেষণ করে এমন চাঞ্চল্যকর চিত্র পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। প্রথম ঘটনায় অনলাইন বিনিয়োগের ফাঁদে পড়ে ৫০ লাখ ৬৭ হাজার ৩১০ টাকা হারিয়েছেন ৬০ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত মো. আমিনুর রহমান। ২০২৫ সালের ২৬ অক্টোবর ফেসবুকে আনিশা রহমান নামের এক নারীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়। আনিশা নিজেকে bgecapitase.com নামক একটি ওয়েবসাইটের সফল বিনিয়োগকারী দাবি করে আমিনুরকে প্রলুব্ধ করেন। পরবর্তীতে ১২ নভেম্বর বিকেলে রমনা মডেল থানাধীন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সোনালী ব্যাংক শাখায় অবস্থানকালে ওই সাইটে অ্যাকাউন্ট খোলেন তিনি। শুরুতে বিকাশের মাধ্যমে ৩৬ হাজার ৬২০ টাকা জমা দিলে তাকে ৫ হাজার ৪০০ টাকা লাভসহ মোট ৪২ হাজার ২০ টাকা ব্যালেন্স দেখানো হয়। এই কৃত্রিম লাভ দেখিয়ে তার আস্থা অর্জন করা হয়। এরপর কাস্টমার সার্ভিসের কথা বলে ধাপে ধাপে প্রায় তিন মাসে তার কাছ থেকে ৫০ লাখের বেশি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। এ ঘটনায় আনিশা রহমান, তার ব্যবহৃত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর এবং ওয়েবসাইটের নেপথ্যে থাকা দেশি-বিদেশি অজ্ঞাতনামা চক্রের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন আমিনুর। দ্বিতীয় ঘটনায় পারিবারিক পরিচিতির সুযোগ নিয়ে ৮৩ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত মেজর এম আনিসুর রহমানের কাছ থেকে ১০ কোটি ৪আই লাখ ৬৭ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তানভীর রায়হান রিজভী ও তার ভাই জহির রায়হানের বিরুদ্ধে। ২০২০ সালে চুক্তির ভিত্তিতে বার্ষিক মুনাফার আশ্বাসে প্রথমে ৭ কোটি ৮১ লাখ ৬৭ হাজার টাকা এবং ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে পণ্য আমদানির নামে আরও কয়েক কোটি টাকা নেন রিজভী। শুরুতে কিছু টাকা ফেরত দিলেও লভ্যাংশ বা মূল টাকা পরিশোধ না করে ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন তিনি। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে লিখিত চুক্তির মাধ্যমে টাকা ফেরতের প্রতিশ্রুতি দিলেও তা রক্ষা করেননি। অবশেষে ২০২৫ সালের ৭ মে উত্তরা পূর্ব থানায় দণ্ডবিধির ৪০৬ ও ৪২০ ধারায় মামলা করেন ভুক্তভোগী মেজর। মামলায় মূলধন ও এপ্রিল ২০২৫ পর্যন্ত লভ্যাংশ মিলিয়ে মোট ১০ কোটি ৪১ লাখ ৬৭ হাজার টাকা পাওনা দাবি করা হয়েছে। আদালত অভিযুক্ত রিজভীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দিলেও ২০২৬ সালের ২৯ জুলাই রিভিশন আবেদনের মাধ্যমে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়। এই চক্রের বিরুদ্ধে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় আরও চারটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। তৃতীয় ও সবচেয়ে বড় প্রতারণার ঘটনাটি ঘটেছে ‘নাজরান ফিশারীজ এন্ড এগ্রো প্রজেক্ট’-এর নামে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) জানিয়েছে, এই চক্রটি প্রতি ১ লাখ টাকা বিনিয়োগে মাসে ৩ হাজার টাকা লাভ এবং ৩৩ মাসে বিনিয়োগ দ্বিগুণ করার প্রলোভন দেখাত। এই ফাঁদে পড়ে ২০২৩ সালের মে মাসে ভাটারা এলাকার কুড়িল চৌরাস্তা সংলগ্ন কার্যালয়ে গিয়ে এক নারী ও তার বান্ধবীরা বিনিয়োগ শুরু করেন। শুরুতে আস্থা অর্জনে ৪২ হাজার টাকা দেওয়া হলেও পরে জুলাইয়ে তারা ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে আরও ৫০ লাখ টাকা এবং প্লট কেনার নামে ১ কোটি ৬৩ লাখ ৯৮ হাজার টাকা বিনিয়োগ করেন। এর বিপরীতে মাত্র ১৮ লাখ ৭২ হাজার টাকা লভ্যাংশ দেওয়ার পর চক্রটি কার্যালয় বন্ধ করে আত্মগোপনে চলে যায়। সিআইডি তদন্তে জানতে পেরেছে, প্রতিষ্ঠানটির চারটি ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়া মো. ওবায়েদুল্লাহর ১৪টি ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবেই আড়াই কোটি টাকার লেনদেন পাওয়া গেছে। এছাড়া, ২০২৫ সালের মে মাসে প্রায় ১৫ হাজার ভুক্তভোগী ৮০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধন করেছিলেন, যা বর্তমানে যাচাই করছে সিআইডি। ওবায়েদুল্লাহকে রাজধানীর সবুজবাগের বাসাবো এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এই সুসংগঠিত জালিয়াতির বিষয়ে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন খান সাধারণ মানুষকে আরও সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, কোনো অচেনা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রলোভনে পড়ে হুট করে বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেন করা যাবে না এবং লেনদেনের আগে অবশ্যই প্রতিষ্ঠানের বৈধতা যাচাই করতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, এ ধরনের প্রতারণা ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানোর পাশাপাশি আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মানুষের আর্থিক সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। SHARES অন্যান্য বিষয়: অনলাইন প্রতারণাঅবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবীঅর্থ আত্মসাৎনাজরান ফিশারীজপ্রতারণাসিআইডি