প্রকৃতির তিন উপমায় মানুষের জীবনশিক্ষা দিচ্ছে পবিত্র কোরআন প্রকাশিত: ৯:৩২ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৯, ২০২৬ পবিত্র কোরআনে কেবল মহান আল্লাহর কুদরত বা শক্তির প্রকাশ ঘটাতেই প্রকৃতি ও সৃষ্টিজগতের নানা উপমা দেওয়া হয়নি; বরং এসবের মাধ্যমে মানুষকে নিজের জীবন নিয়ে ভাবতে এবং চারপাশের জগতকে নতুনভাবে দেখতে শেখানো হয়েছে। পাথর, বাগান কিংবা বাতাসের ছাইয়ের মতো নানা উপমার পর এবার মৌমাছির সুশৃঙ্খল জীবনব্যবস্থা, ফসলের বেড়ে উঠে শুকিয়ে যাওয়া এবং খাদের কিনারার রূপকের মাধ্যমে মানবজীবনের তিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তুলে ধরা হয়েছে। প্রথম শিক্ষাটি আসে মৌমাছির সুশৃঙ্খল জীবন থেকে। সুরা নাহলের ৬৮ ও ৬৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আপনার পালনকর্তা মৌমাছিকে আদেশ করলেন—তুমি পাহাড়ে, গাছে এবং মানুষ যে মাচান তৈরি করে তাতে ঘর বানাও। অতঃপর প্রত্যেক ফল থেকে আহার করো এবং তোমার প্রতিপালকের সহজ পদ্ধতি অনুসরণ করো। এর পেট থেকে বিভিন্ন রঙের পানীয় বের হয়। এতে মানুষের জন্য রয়েছে আরোগ্য। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল মানুষের জন্য নিদর্শন রয়েছে।’ প্রকৃতির এই ক্ষুদ্রতম প্রাণীর সুশৃঙ্খল জীবন থেকে মানুষের জন্য বড় শিক্ষা হলো ওহি বা আল্লাহর বিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা। মৌমাছি নিজের খেয়ালখুশি মতো না চলে সৃষ্টিকর্তার দেওয়া নিয়ম মেনে বাসা তৈরি করে ও আহার সংগ্রহ করে। মানুষের জীবনও তখনই অর্থবহ হয়, যখন সে নিজের প্রবৃত্তির চেয়ে ঐশী বিধানকে প্রাধান্য দেয়। মৌমাছির জীবন থেকে পাওয়া আরেকটি বড় শিক্ষা হলো অন্যের ক্ষতি না করা। মৌমাছি অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন উৎস থেকে রস সংগ্রহ করে এবং তা থেকে মধুর মতো উপকারী ও আরোগ্যদায়ক উপাদান তৈরি করে। সবচেয়ে চমৎকার বিষয় হলো, মধু সংগ্রহের সময় ফুলটির কোনো ক্ষতি হয় না। মুসনাদে আহমদের ৬৮৭২ নম্বর হাদিসে এই প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি বাণী বর্ণিত হয়েছে। তিনি শপথ করে বলেছেন, মুমিনের উদাহরণ হলো মৌমাছির মতো; সে পবিত্র জিনিস খায়, পবিত্র জিনিসই উপশম হিসেবে বের করে এবং ফুলে বসার সময় তা ভেঙে ফেলে না বা নষ্ট করে না। এই ক্ষুদ্র প্রাণীর শৃঙ্খলা ও হেকমত নিয়ে চিন্তা করলেই মানুষের সামনে স্রষ্টার কুদরত আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দ্বিতীয় শিক্ষাটি পাওয়া যায় ফসলের সজীবতা ও তা শুকিয়ে যাওয়ার চক্র থেকে, যা মানুষের ক্ষণস্থায়ী জীবনের চমৎকার প্রতিচ্ছবি। সুরা হজের ৫ নম্বর আয়াতে মানুষের সৃষ্টিপ্রক্রিয়া—মাটি, বীর্য, রক্তপিণ্ড ও মাংসপিণ্ড থেকে শুরু করে শৈশব, যৌবন ও জরাগ্রস্ত বার্ধক্যের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। সেখানে শুষ্ক ভূমিতে বৃষ্টি বর্ষণের পর তা শস্য-শ্যামল হয়ে ওঠার উদাহরণও রয়েছে। একইভাবে সুরা হাদীদের ২০ নম্বর আয়াতে দুনিয়ার জীবনকে খেল-তামাশা ও পারস্পরিক অহংকারের প্রতিযোগিতা হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, এর উপমা হলো সেই বৃষ্টি, যার ফসল কৃষকদের আনন্দ দেয়, কিন্তু পরে তা শুকিয়ে হলুদ হয়ে খড়কুটায় পরিণত হয়। বৃষ্টির ছোঁয়ায় ফসলের সজীবতার মতোই মানুষের জীবনও শৈশব ও যৌবনে পূর্ণতা পায়। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে যেমন ফসল শুকিয়ে যায়, তেমনি মানুষের জীবনেও বার্ধক্য ও দুর্বলতা নেমে আসে এবং মৃত্যুর মাধ্যমে সবকিছুর সমাপ্তি ঘটে। তাই দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী সাফল্যে মগ্ন না হয়ে স্থায়ী আখেরাতের প্রস্তুতি নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। তৃতীয় শিক্ষাটি হলো খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকার উপমা, যা মূলত মানুষের দোদুল্যমান ও দুর্বল ইমানকে নির্দেশ করে। সুরা হজের ১১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর মানুষের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহর ইবাদত করে এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে। তার কোনো কল্যাণ হলে তাতে সে সন্তুষ্ট হয়; কিন্তু তার ওপর কোনো পরীক্ষা এলে সে পিছিয়ে যায়। ফলে সে দুনিয়া ও আখেরাত—উভয়ই হারায়। এটাই সুস্পষ্ট ক্ষতি।’ খাদের কিনারায় দাঁড়ানো একজন মানুষ যেমন সামান্য ভারসাম্য হারালেই নিচে পড়ে যায়, দুর্বল ইমানের মানুষও তেমনি সুখের দিনে ইবাদতে স্থির থাকলেও বিপদে পড়লেই ইমান হারিয়ে ফেলে। আয়াতে ব্যবহৃত ‘হারফুন’ শব্দের অর্থ কিনারা বা প্রান্ত। মাত্র একটি শব্দের এই নিখুঁত রূপকের মাধ্যমে কোরআন মানুষের দোদুল্যমান মানসিক ও আধ্যাত্মিক অবস্থাকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। প্রকৃতি ও জীবনের এসব গভীর শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করেছেন আলেম, লেখক ও অনুবাদক মওলবি আশরাফ। SHARES ধর্ম বিষয়: ইসলাম ও জীবনকোরআনের শিক্ষাক্ষণস্থায়ী জীবনদুর্বল ইমানপ্রকৃতির উপমামৌমাছির জীবনব্যবস্থা