উত্তরাধিকার বণ্টন: পবিত্র কোরআনের সুনির্দিষ্ট বিধান ও নির্দেশনা

প্রকাশিত: ১০:০৩ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১০, ২০২৬

আল্লাহতায়ালা মানুষের হেদায়াতের জন্য প্রত্যেক নবী-রাসুলের ওপর কিতাব নাযিল করেছেন এবং হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে দিয়েছেন পবিত্র কোরআন। এটি মানবজাতির জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ সংবিধান, যার ভাষা, অলংকার, ছন্দ ও ভাবের গভীরতার কোনো তুলনা নেই। বিশেষ করে উত্তরাধিকার আইন বা ফারায়েজ বিষয়ে কোরআনে বিস্তারিত নির্দেশনা রয়েছে। ফারায়েজ আইনের প্রথম ও প্রধান উৎস এই পবিত্র কিতাব।

কোরআনের সুরা নিসার সপ্তম, একাদশ, দ্বাদশ এবং একশ ছিয়াত্তরতম আয়াতে উত্তরাধিকারের নিয়মসমূহ প্রত্যক্ষভাবে বিধৃত হয়েছে। মূলত ওহুদ যুদ্ধের পর যখন সত্তরজন মুসলিম শহীদ হন, তখন তাদের রেখে যাওয়া সম্পদের উত্তরাধিকার বণ্টন নিয়ে বহু পরিবারের সামনে প্রশ্ন দেখা দেয়। এই আয়াতগুলো সেই সমস্যার সমাধান হিসেবে নাযিল হয়। সুরা নিসার সপ্তম আয়াতে বলা হয়েছে, বাবা-মা ও আত্মীয়-স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে নারী ও পুরুষ উভয়েরই নির্ধারিত অংশ রয়েছে। এটি তৎকালীন আরবের নারীদের বঞ্চিত করার নিষ্ঠুর কুপ্রথার বিরুদ্ধে একটি বলিষ্ঠ প্রতিবাদ। এখানে 'ওয়ালিদান' শব্দের মাধ্যমে বাবা-মা ও সন্তানদের সম্পর্ক এবং 'আকরাবুন' শব্দের মাধ্যমে নিকটাত্মীয়দের বোঝানো হয়েছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে নিকটাত্মীয় বিদ্যমান থাকলে দূরবর্তী আত্মীয়রা বঞ্চিত হবে।

উত্তরাধিকার বণ্টনের সুনির্দিষ্ট নিয়ম শুরু হয় সুরা নিসার ১১ নম্বর আয়াত থেকে। এখানে বলা হয়েছে, একজন পুরুষের অংশ দুজন নারীর অংশের সমান। যদি মৃত ব্যক্তির সন্তান থাকে, তবে পুত্র ও কন্যা প্রত্যেকে তাদের অংশ পাবে। যদি দুইয়ের অধিক কন্যা থাকে, তবে তারা পরিত্যক্ত সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ পাবে। মাত্র এক কন্যা থাকলে সে অর্ধাংশ পাবে। মৃত ব্যক্তির সন্তান থাকলে বাবা-মা প্রত্যেকে ষষ্ঠাংশ পাবে, আর সন্তান না থাকলে মায়ের জন্য এক-তৃতীয়াংশ বরাদ্দ থাকবে। হাদিস থেকে জানা যায়, উহুদের যুদ্ধে শহীদ হওয়া সাদ বিন রাবির দুই মেয়ের উত্তরাধিকার নিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে অভিযোগ আসার পর এই আয়াতটি নাযিল হয়। নবী (সা.) নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, ওই দুই মেয়েকে দুই-তৃতীয়াংশ এবং তাদের মাকে এক-অষ্টমাংশ দেওয়ার পর অবশিষ্ট অংশ তাদের জেঠাকে দিতে হবে।

সুরা নিসার ১২ নম্বর আয়াতে স্বামী ও স্ত্রীর অংশ বর্ণনা করা হয়েছে। মৃত স্ত্রীর সন্তান না থাকলে স্বামী পাবে অর্ধাংশ, আর সন্তান থাকলে পাবে এক-চতুর্থাংশ। একইভাবে স্ত্রীর ক্ষেত্রেও স্বামী সন্তানহীন হলে স্ত্রী এক-চতুর্থাংশ এবং সন্তান থাকলে এক-অষ্টমাংশ পাবে। এছাড়া বৈপিত্রেয় ভাই-বোনের ক্ষেত্রেও কোরআনে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।

সুরা নিসার ১৭৬ নম্বর আয়াতে 'কালালা' বা নিঃসন্তান ও পিতা-মাতাহীন ব্যক্তির উত্তরাধিকারের কথা বলা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি সন্তানহীন অবস্থায় মারা গেলে তার বোন পরিত্যক্ত সম্পত্তির অর্ধেক পাবে। যদি দুই বোন থাকে, তবে তারা দুই-তৃতীয়াংশ পাবে। আর ভাই-বোন উভয়ই থাকলে পুরুষ পাবে নারীর দ্বিগুণ। আল্লাহতায়ালা এই বিধানগুলো সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন যাতে মানুষ বিভ্রান্তিতে না পড়ে।