জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সৌরবিদ্যুতে বড় সম্ভাবনা

প্রকাশিত: ১০:০২ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২৬

১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (14 September 2026) তারিখে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তীব্র লোডশেডিং ও জ্বালানি সংকটের কারণে দেশে যখন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে, তখন আমদানিনির্ভর জ্বালানির চাপ কমাতে সৌরশক্তি বাংলাদেশের সামনে এক বিশাল সম্ভাবনা হিসেবে দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাস ও কয়লার অস্থিরতা এবং সরবরাহ সংকটের মুখে সরকার এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। এই লক্ষ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, নেট মিটারিং, ব্যাটারি সংরক্ষণ ও স্মার্ট প্রযুক্তির সমন্বয়ে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

জাতীয় সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের বিদ্যুতের চাহিদা ২৪ থেকে ২৫ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে। এই চাহিদা পূরণে সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে অন্তত ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে তা ৩০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এই লক্ষ্য অর্জনে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি সাধারণ বাড়ি, শিল্পকারখানা, অফিস ও সরকারি ভবনের ছাদকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা নিয়ে ডিস্ট্রিবিউটেড রিনিউএবল এনার্জি প্ল্যাটফর্মের (ডিআরইপি) এক সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে আশাব্যঞ্জক তথ্য উঠে এসেছে। সংস্থাটির মতে, গৃহস্থালি পর্যায়ে ব্যাপকভাবে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করা গেলে দেশে সর্বোচ্চ ২১ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি করা সম্ভব, যা জাতীয় বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ৩৫ শতাংশ পূরণ করতে পারে। অন্যদিকে, সীমিত পরিসরে মাত্র ১০ শতাংশ পরিবার যদি ১ থেকে ৫ কিলোওয়াট-পিক ক্ষমতার ছাদভিত্তিক সৌর প্যানেল স্থাপন করে, তবে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৮ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট-পিক সক্ষমতা অর্জন করা যাবে। এর মাধ্যমে বছরে প্রায় ১৩ হাজার ৯৩৭ গিগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব, যা দেশের বর্তমান জাতীয় চাহিদার প্রায় ১৫ শতাংশের সমান।

ভবিষ্যতের এই বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে প্রযুক্তির ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্মার্ট মিটার, সেন্সর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিদ্যুতের উৎপাদন, চাহিদা ও সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। আবহাওয়া পূর্বাভাস বিশ্লেষণ করে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের আগাম ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে, যার ফলে দিনের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যাটারিতে জমা রেখে রাতে ব্যবহার করা যাবে। এছাড়া অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সুযোগও থাকবে। এর ফলে হাসপাতাল, কারখানা ও সরকারি ভবনগুলো একেকটি ছোট বিদ্যুৎকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।

শিল্প ও কৃষিখাতেও সৌরশক্তি বড় পরিবর্তন আনতে পারে। শিল্পকারখানার বিশাল ছাদ ব্যবহার করে দিনের বেলার বিদ্যুৎ চাহিদা নিজেদের সৌর প্যানেল থেকেই মেটানো সম্ভব, যা উৎপাদন সচল রাখতে সাহায্য করবে। কৃষিতে সৌরচালিত সেচ পাম্পের ব্যবহার বাড়লে ডিজেলের ওপর নির্ভরতা কমবে। পাশাপাশি হিমাগার, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র শিল্পেও সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

সম্ভাবনা অনেক থাকলেও বর্তমানে বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের বাস্তব চিত্র এখনো সীমিত। বর্তমানে দেশে নেট মিটারিং ব্যবস্থার আওতায় মাত্র ৪ হাজার ৫৫১টি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালু রয়েছে, যার মোট উৎপাদন সক্ষমতা ২১৩ দশমিক ৩ মেগাওয়াট। এর মধ্যে ৬০ দশমিক ৪ শতাংশ সক্ষমতাই কেবল ঢাকা বিভাগে সীমাবদ্ধ। জাতীয় পর্যায়ে এই সম্ভাবনাকে ছড়িয়ে দিতে হলে সহজ শর্তে ঋণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, দ্রুত গ্রিড সংযোগ, দক্ষ জনবল ও নীতিগত স্থিতিশীলতা প্রয়োজন।

সূর্যের আলোর ওপর নির্ভরশীলতার কারণে সৌরবিদ্যুতের বড় সীমাবদ্ধতা হলো রাতের বেলা বা মেঘলা আবহাওয়ায় এর উৎপাদন বন্ধ বা কমে যাওয়া। তাই বিপুল পরিমাণ সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে হলে সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে এবং ব্যাটারি সংরক্ষণ প্রযুক্তির খরচ কমাতে হবে। এছাড়া ভবিষ্যতে পুরোনো সৌর প্যানেলের পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পুনর্ব্যবহারের পরিকল্পনাও এখন থেকেই করা জরুরি। জ্বালানি আমদানির চাপ কমাতে নেট মিটারিং প্রক্রিয়া সহজ করা, বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা এবং গ্রিডের সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব।