সারিয়াকান্দিতে শামুক-ঝিনুকের তীব্র সংকটে বিলুপ্তির পথে চুনশিল্প

প্রকাশিত: ১১:৪৯ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬

বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার নদী-নালা আর খাল-বিলে শামুক-ঝিনুকের তীব্র সংকটে পড়েছেন স্থানীয় চুন কারিগররা। একসময় এসব জলাশয়ে প্রচুর শামুক-ঝিনুক পাওয়া যেত, যা সংগ্রহ করে পুড়িয়ে চুন তৈরি করাই ছিল শত শত পরিবারের জীবিকার প্রধান উৎস। তবে পরিবেশ বিপর্যয় ও নদী শুকিয়ে যাওয়ার কারণে কাঁচামালের সরবরাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে বংশপরম্পরায় চলে আসা এই শিল্প থেকে দুই শতাধিক পরিবার সরে যেতে বাধ্য হয়েছে। বর্তমানে অর্থাভাব ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও মাত্র পাঁচটি পরিবার কোনোমতে এই ঐতিহ্য আঁকড়ে টিকে আছে।

উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৫০০ মিটার পশ্চিমে পৌর এলাকার হিন্দুকান্দি গ্রামে বসবাসকারী এই চুন কারিগরদের একমাত্র পেশা চুন তৈরি ও তা পূর্ব বগুড়ার বিভিন্ন হাটবাজারে বিক্রি করা। চুন তৈরির প্রক্রিয়ায় সংগৃহীত শামুক-ঝিনুক মাটির তৈরি চুলোয় প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে পোড়ানো হয়। আনুমানিক ২০-২৫ কেজি ঝিনুক পোড়াতে প্রয়োজন হয় প্রায় এক মণ জ্বালানি কাঠ। এরপর পোড়া ঝিনুকগুলো বিশেষ হাউজ মেশিনে কাঠের লাঠি দিয়ে ঘোটানো হয়। দুজন শ্রমিকের টানা পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টার পরিশ্রমে এক মণ চুন তৈরি হয়, যা বিক্রি করে খরচ বাদে লাভ থাকে প্রায় আড়াই হাজার টাকা। এই সামান্য আয়ে সংসার চালানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন তারা।

৭০ বছর বয়সি কারিগর সুদেব চন্দ্র জানান, আগে নদী থেকে নিজেরাই ঝিনুক সংগ্রহ করতে পারতেন, কিন্তু এখন নদী শুকিয়ে যাওয়ায় তা সম্ভব হচ্ছে না। বাধ্য হয়ে শহরের পাইকারদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে তাদের। সুদেব চন্দ্র আক্ষেপ করে বলেন, চুন তৈরি করে এখন আর সংসার চলে না। অন্তারপাড়া গ্রামের শতাধিক পরিবার এই ব্যবসা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছে। আগে স্থানীয় মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা গেলেও, এখন আর কেউ ঋণও দিতে চায় না।

একই গ্রামের আরেক কারিগর অনিল চন্দ্র জানান, আগে বাড়ির পাশের নদী-নালা ও খালে হাত বাড়ালেই প্রচুর শামুক-ঝিনুক পাওয়া যেত। এখন পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, বগুড়া শহরতলির মাটিডালি এলাকা থেকে প্রতি মণ শামুক-ঝিনুক ৩ হাজার ৪০০ টাকা দরে কিনে আনতে হচ্ছে। শুকনো মৌসুমেও আগে কিছু শামুক-ঝিনুক পাওয়া গেলেও এখন তাও উধাও। চড়া দামে কাঁচামাল কিনে চুন তৈরি করে আর পোষাচ্ছে না। প্রাকৃতিক সম্পদের বিলুপ্তি এবং সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ঐতিহ্যবাহী এই চুনশিল্প এখন বিলুপ্তির পথে এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা চরম আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন।

প্রকাশ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১: ২৭আপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১: ৪৩