হৃদরোগ প্রতিরোধ ও সচেতনতায় করণীয়: চিকিৎসকের পরামর্শ

প্রকাশিত: ১০:০৩ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১১, ২০২৬

দেহের অন্যতম প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হলো হৃৎপিণ্ড, যা রক্ত পাম্প করার মাধ্যমে শরীরে অক্সিজেন ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করে। হৃৎপিণ্ডের বিভিন্ন জটিলতাকে একত্রে হৃদরোগ বলা হয়, যার মধ্যে হার্ট অ্যাটাক, করোনারি আর্টারি ডিজিজ, হার্ট ফেইলিউর, ভালভজনিত সমস্যা এবং অনিয়মিত হৃত্স্পন্দন অন্যতম। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় এক কোটি ৯৮ লাখ মানুষ হৃদরোগে প্রাণ হারান, যার মধ্যে বাংলাদেশে প্রতি বছর দুই থেকে আড়াই লাখ মানুষের মৃত্যুর কারণ এই রোগ।

বর্তমানে কম বয়সীদের মধ্যেও হৃদরোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়া উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, মানসিক চাপ, ধূমপান, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও স্থূলতার মতো বিষয়গুলো হৃদরোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। হৃৎপিণ্ডে সামান্য সমস্যা দেখা দিলেও তা পুরো শরীরে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে রোগীরা প্রাথমিক উপসর্গগুলোকে গুরুত্ব না দেওয়ার কারণে চিকিৎসা নিতে দেরি হয়, যা জটিলতা বাড়িয়ে দেয়।

হার্ট অ্যাটাকের সবচেয়ে পরিচিত লক্ষণ হলো বুকে চাপ লাগা, ভারী অনুভূতি বা তীব্র ব্যথা। এই ব্যথা অনেক সময় বাঁ হাত, দুই হাত, কাঁধ, ঘাড়, চোয়াল কিংবা পিঠে ছড়িয়ে পড়ে। তবে নারী, প্রবীণ ও ডায়াবেটিক রোগীদের ক্ষেত্রে সব লক্ষণ সবসময় একইভাবে প্রকাশ পায় না। এছাড়াও শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত ঘাম হওয়া, বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা এবং অস্বাভাবিক দুর্বলতা হৃদরোগের সংকেত হতে পারে। এমন উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার হৃদরোগের অন্যতম প্রধান ঝুঁকির কারণ। পাশাপাশি শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, রক্তে কোলেস্টেরল বৃদ্ধি, অতিরিক্ত লবণ ও চর্বিযুক্ত খাবার গ্রহণ, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব এবং বংশগত কারণগুলো ঝুঁকি বাড়াতে ভূমিকা রাখে।

অধিকাংশ হৃদরোগ প্রতিরোধযোগ্য। সুস্থ থাকতে প্রতিদিন অন্তত ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট হাঁটা বা ব্যায়াম করা আবশ্যক। ধূমপান পুরোপুরি বর্জন করতে হবে এবং খাদ্যতালিকায় তাজা শাক-সবজি, ফলমূল, মাছ ও আঁশযুক্ত খাবার রাখতে হবে। অতিরিক্ত লবণ, চিনি, ট্রান্স ফ্যাট, কোমল পানীয় ও তেলজাতীয় খাবার এড়িয়ে চলা জরুরি। সেই সঙ্গে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

৪০ বছর বয়সের পর নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা উচিত। বিশেষ করে ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ থাকলে অথবা হৃদরোগের পারিবারিক ইতিহাস থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে ইসিজি, ইকোকার্ডিওগ্রাম, লিপিড প্রোফাইল বা ট্রেডমিল টেস্টের মতো পরীক্ষাগুলো করিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসা সহজ ও সফল হয়।

অনেকেই হৃদরোগের চিকিৎসা মানেই ওপেন হার্ট সার্জারি মনে করেন, যা সবসময় সঠিক নয়। ওষুধ, এনজিওগ্রাম, এনজিওপ্লাস্টি, স্টেন্ট ও পেসমেকার স্থাপনের মাধ্যমেও হৃদরোগ নিয়ন্ত্রণ বা নিরাময় সম্ভব। অনেক ক্ষেত্রে উন্নত ল্যাপারোস্কোপি পদ্ধতি ব্যবহার করে কার্যকর চিকিৎসা করা যায়। বুকে ব্যথা বা হার্ট অ্যাটাকের সন্দেহ হলে নিজে থেকে কোনো ওষুধ না খেয়ে দ্রুত নিকটস্থ বিশেষায়িত হাসপাতালে কার্ডিয়াক বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। হার্ট অ্যাটাকের সময় প্রতিটি মিনিট মূল্যবান, তাই যত দ্রুত চিকিৎসা শুরু হবে, হৃৎপেশি তত বেশি রক্ষা করা সম্ভব হবে।