পদ্মার ভাঙনে বিলীন চাঁপাইনবাবগঞ্জের মানচিত্র, বাস্তুহারা হাজারো পরিবার প্রকাশিত: ১২:০১ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১১, ২০২৬ চাঁপাইনবাবগঞ্জে পদ্মা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে একের পর এক বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এবারের বন্যার পরবর্তী সময়ে সদর উপজেলার নারায়ণপুর এবং শিবগঞ্জ উপজেলার দুর্লভপুর, নামোজগন্নাথপুর, ফিল্ডেরহাট, কানছিরা, বোগলাউড়ি ও ঝাইলপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় অন্তত এক হাজার পরিবারের বাড়িঘর নদীগর্ভে চলে গেছে। ভাঙন আতঙ্কে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেওয়া হলেই রাতবিরাতে মানুষ ছুটে আসছেন একে অন্যের বাড়িঘর সরাতে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, গত চার-পাঁচ বছরে নদীভাঙনের কারণে অনেক পরিবারকে ৮ থেকে ১০ বার পর্যন্ত বসতভিটা বদলাতে হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ জমিজমা হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন। পদ্মার ভাঙনে নদীতীরবর্তী এলাকার চেনা মানচিত্রই বদলে গেছে। নারায়ণপুর, পাঁকা, উজিরপুর ও দুর্লভপুর ইউনিয়নের কয়েকটি এলাকায় গত কয়েক বছরে নদী প্রায় ৭ থেকে ৮ কিলোমিটার ভেতরে ঢুকে পড়েছে। বসতভিটা ও আবাদি জমি হারিয়ে অনেকে এখন ভূমিহীন ও বাড়িঘরহীন অবস্থায় অন্যের জমিতে আশ্রয় নিয়েছেন। পাঁকা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক মন্ডল জানান, গত ১০ দিন ধরে পাঁকা ইউনিয়নের নিশিপাড়া, দক্ষিণ পাঁকা, ২০ রশিয়া, জ্যাকপাড়া, দোভাগী এবং পাশের ইউনিয়নের মনোহরপুর ও ফিল্ডেরহাট এলাকায় ব্যাপক নদী ভাঙন চলছে। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কেবল পাঁকা ও আশপাশের ইউনিয়নেই প্রায় ৫০০ পরিবারের বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ফিল্ডেরহাট এলাকার বাসিন্দা মাহবুব আলম, মোশাররফ হোসেন এম ও সাদিকুল ইসলাম জানান, দুলাল, রোজবুল, মান্নান, রফিক, সালাম, জিয়াউল ও বাবরসহ অসংখ্য মানুষের বাড়িঘর নদীগর্ভে চলে গেছে। তাঁরা দ্রুত নদীতীর সংরক্ষণ ও বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন। বসতভিটার পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের হিসাবে, ভাঙনে কয়েক হাজার একর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নদীর দুই তীরের প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে কোথাও কোথাও আবাদি জমি কেটে তৈরি হয়েছে বিস্তীর্ণ বালুচর। পাঁকা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক মন্ডল জানান, পানি সরে যাওয়ার পর প্রায় ৪ হাজার একর জমিতে গম, সরিষা ও ভুট্টার আবাদ জরুরি, কিন্তু বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে না পারায় কৃষকদের হাতে অর্থ নেই। এ অবস্থায় সরকারি উদ্যোগে বিনা মূল্যে বীজ সরবরাহের দাবি জানান তিনি। স্থানীয়দের অভিযোগ, উজানে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে ভারতের ফারাক্কা বাঁধের কারণে পদ্মার গতিপথ ও প্রবাহে পরিবর্তন এসেছে। তাঁদের দাবি, বর্ষায় ফারাক্কার গেট খুলে দেওয়ার পর নদীর মূল প্রবাহ কয়েকটি শাখায় বিভক্ত হওয়ায় ভাঙন তীব্র হয়েছে এবং কোনো কোনো স্থানে নদীর দুই তীরের দূরত্ব ১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত বেড়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ফারাক্কা বাঁধের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কের বিষয়টি কারিগরি ও বৈজ্ঞানিকভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মেহেদী হাসান মিশু জানান, এই ভাঙন রোধে ৭৪৮ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে চলতি বছর প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাঁধ নির্মাণ ও সংরক্ষণকাজ হবে। প্রকল্পের আওতায় ১৬টি বামতীরে ১ হাজার ৯৪০ মিটার এবং ৭টি ডানতীরের ৩ দশমিক ৯০ কিলোমিটার বাঁধ রক্ষার কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এছাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের অন্য এক প্রকৌশলী জানান, মনোহরপুর, আইয়ব বিশ্বাসের টোলা, নামো জগনাথপুর, ডাইলপাড়া, পাঁকা কানছিড়া, সদর উপজেলার নারায়নপুর চর, আলাতুলি দেবিনগর ও হড়মা এলাকায় ভাঙন চলমান রয়েছে। তবে বিগত সরকারের আমলে সুন্দরপুর থেকে আলাতুলি ইউনিয়ন পর্যন্ত বামতীর সংরক্ষণ প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছিল, যেখানে ভবিষ্যতে আর ভাঙন হবে না বলে আশা করা হয়েছিল। SHARES পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়: চাঁপাইনবাবগঞ্জনদী ভাঙননারায়ণপুরপদ্মা নদীশিবগঞ্জ