বিপদ ও দুর্ঘটনার মুখোমুখি হলে ইসলামে কী করতে বলা হয়েছে?

প্রকাশিত: ৯:০২ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ১৭, ২০২৬

ইসলামের দৃষ্টিতে এই পৃথিবী মুমিনের জন্য একটি পরীক্ষাস্থল। মহান আল্লাহতায়ালা বিভিন্ন সময়ে নানা প্রতিকূলতা দিয়ে তাঁর বান্দাদের পরীক্ষা করে থাকেন। পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারার ১৫৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, ‘আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা, সম্পদ, প্রাণ ও ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।’ এই বাণী স্পষ্ট করে দেয় যে, দুনিয়ার বুকে ঘটে যাওয়া যাবতীয় বিপদ, কষ্ট ও দুর্ঘটনা মূলত আল্লাহর পক্ষ থেকে এক ধরণের পরীক্ষা, যার মাধ্যমে মানুষের ঈমান, তাকওয়া ও ধৈর্য যাচাই করা হয়।

যেকোনো দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে হতাশ না হয়ে একজন মুমিনের উচিত আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা রাখা এবং ধৈর্য ধারণ করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘একজন মুসলমান কোনো কষ্ট, অসুখ, উদ্বেগ, দুঃখ, দুশ্চিন্তা কিংবা বিষণ্ণতায় পতিত হলে, এমনকি তার শরীরে কোনো কাঁটা বিঁধলেও, আল্লাহ তাতে তার গুনাহ মাফ করে দেন।’ (বোখারি: ৫৬৪১)। এই হাদিস থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে, সাময়িক কষ্টের বিনিময়ে আল্লাহ বান্দার গুনাহ ক্ষমা করে দেন, যা পরকালীন মুক্তির পথকে সুগম করে।

পৃথিবীর ইতিহাসে আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় বান্দা তথা নবী-রাসুলরাও কঠিন সব পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছেন। হজরত ইউসুফ (আ.)-কে তাঁর ভাইয়েরা কূপে ফেলে দিয়েছিল এবং পরে তিনি দাস হিসেবে বিক্রি হয়েছিলেন। হজরত আইয়ুব (আ.) দীর্ঘ ১৮ বছর কঠিন রোগে ভুগেছেন এবং তাঁর সমস্ত সন্তান ও সম্পদ হারিয়েছেন। স্বয়ং শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনে উহুদের যুদ্ধ, তায়েফের নির্মম ঘটনা এবং প্রিয় স্ত্রী খাদিজা ও চাচা আবু তালিবের মৃত্যুর মতো কঠিন সব পরীক্ষা এসেছে। সুরা আনকাবুতের ২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘আপনি কি মনে করেন যে, আপনি ঈমান আনবেন এবং পরীক্ষা করা হবে না?’

দুর্ঘটনার মুহূর্তে একজন মুসলমানের জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট করণীয় রয়েছে। প্রথমত, দুর্ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে সুন্নত আমল হিসেবে ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ পাঠ করা, যা মনে করিয়ে দেয় যে আমরা আল্লাহরই এবং তাঁর কাছেই আমাদের ফিরে যেতে হবে (সুরা বাকারা: ১৫৬)। দ্বিতীয়ত, ধৈর্য ধারণের পাশাপাশি নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করা, যেমনটি সুরা বাকারার ৪৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে। তৃতীয়ত, আল্লাহর ফয়সালার ওপর অবিচল আস্থা রাখা। বাহ্যিকভাবে কোনো ঘটনার কারণ আমাদের বোধগম্য না হলেও এর পেছনে কোনো না কোনো কল্যাণ নিহিত থাকে। চতুর্থত, বেশি বেশি দোয়া করা, কারণ হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী দোয়ার মাধ্যমে ভাগ্যও পরিবর্তন হতে পারে।

বিপদ-আপদ কখনো মানুষের গুনাহের কারণে শাস্তি হিসেবে আসে, আবার কখনো তা বান্দার আত্মিক পরিশুদ্ধির মাধ্যম হিসেবেও দেখা দেয়। তবে মুমিনের জন্য যেকোনো পরিস্থিতিই কল্যাণকর। সহিহ মুসলিমের ২৯৯৯ নম্বর হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মুমিনের অবস্থা আশ্চর্যজনক! তার সব অবস্থাই কল্যাণকর। এটা শুধু মুমিনের জন্যই সম্ভব। যদি সে সুখে থাকে, তবে সে শুকরিয়া আদায় করে, এতে তার জন্য কল্যাণ রয়েছে। আর যদি বিপদে পড়ে, সে ধৈর্য ধারণ করে, তাতেও তার জন্য কল্যাণ রয়েছে।’

ব্যক্তিগত সীমানা ছাড়িয়ে দুর্ঘটনা যখন সামাজিক পর্যায়ে রূপ নেয়, তখন সমাজের মানুষেরও কিছু দায়িত্ব থাকে। ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানো, তাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করা এবং তাদের জন্য দোয়া করা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি দুর্ঘটনা এড়াতে প্রযুক্তিগত সতর্কতা ও সড়ক শৃঙ্খলা মেনে চলা কর্তব্য। একই সঙ্গে তওবা ও ইস্তিগফার বৃদ্ধি করা উচিত, কারণ সমষ্টিগত গুনাহের ফলেই অনেক সময় আল্লাহর গজব নেমে আসে। দুর্ঘটনা মানুষের জন্য হৃদয়বিদারক হলেও তা বিশ্বাসীদের আত্মিক উন্নতির সোপান হতে পারে, যদি তা ধৈর্য, আত্মসমালোচনা এবং আল্লাহর প্রতি গভীর নির্ভরতার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করা যায়।