ইসলামের দৃষ্টিতে সৎ ব্যবসায়ীদের গুণাবলি ও ব্যবসায়িক নির্দেশিকা

প্রকাশিত: ১১:০২ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৬

নবীজি (সা.) ও সাহাবিদের অনেকেই ব্যবসা করেছেন, যা আমাদের জন্য বড় আদর্শ। ব্যবসা হতে হবে ন্যায়-নীতি ও সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গিতে সৎ পথে ব্যবসা পরিচালনা করলে তা ইহকাল ও পরকালে সুফল বয়ে আনে, অন্যদিকে অসৎ উপায়ে ব্যবসার পরিণাম উভয় জগতেই ব্যর্থতা। একজন ব্যবসায়ীর জন্য ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিকনির্দেশনা রয়েছে।

ব্যবসায় ধোঁকা দেওয়া সম্পূর্ণ হারাম। গ্রাহকের আস্থা অর্জনে সততা জরুরি, কারণ বিক্রেতা সৎ হলে ক্রেতারা বারবার ফিরে আসে। মন্দ জিনিসের সঙ্গে ভালো মিশিয়ে ধোঁকা দেওয়া বা পণ্যের দোষ লুকিয়ে রাখা ইসলামে অপছন্দনীয়। আবু হুরায়রা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুল (সা.) একবার খাদ্য বিক্রেতার পণ্যের ভেতরে ভেজা ও নিম্নমানের খাবার দেখে সতর্ক করেছিলেন এবং বলেছিলেন, 'হে খাবারের পণ্যের মালিক! এটা কী?' লোকটি বলল, 'হে আল্লাহর রাসুল! এতে বৃষ্টি পড়েছিল।' রাসুল (সা.) বললেন, 'তুমি সেটাকে খাবারের ওপর রাখলে না কেন, যাতে লোকেরা দেখতে পেত? যে ধোঁকা দেয়, সে আমার উম্মত নয়।' (মুসলিম : ১০২)।

একজন মোমিনের জন্য সত্য বলা অপরিহার্য গুণ। ব্যবসা ক্ষেত্রে মিথ্যা বলা কবিরা গোনাহ। রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, 'একজন মোমিন কি ভীরু হতে পারে?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ।' জিজ্ঞেস করা হলো, 'মোমিন কি কৃপণ হতে পারে?' বললেন, 'হ্যাঁ।' তারপর জিজ্ঞেস করা হলো, 'একজন মোমিন মিথ্যুক হতে পারে?' বললেন, 'না।' (সুনানে বাইহাকি : ৪৮১২)। মিথ্যা বলার শাস্তি অত্যন্ত ভয়াবহ। রাসুল (সা.) বলেছেন, 'সাবধান! মিথ্যা কথা পরিহার কর। নিশ্চয় মিথ্যা পাপাচারের দিকে নিয়ে যায়। আর পাপাচার জাহান্নামের পথে নিয়ে যায়। মানুষ মিথ্যা বলতে থাকে, অবশেষে সে আল্লাহর কাছে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত হয়।' (মুসলিম : ২৬০৭)।

সঠিক ওজনে ক্রেতার কাছে পণ্য হস্তান্তর করা বিক্রেতার কর্তব্য। আল্লাহতায়ালার নবী শুয়াইব (আ.) তার জাতিকে সঠিকভাবে পরিমাপের নির্দেশ দিয়েছিলেন। যারা ওজনে সঠিক পরিমাপ করে, তাদের জন্য রয়েছে ইহকাল ও পরকালে শুভ পরিণাম। আল্লাহতায়ালা বলেন, 'মেপে দেয়ার সময় পূর্ণ মেপে দেবে এবং সঠিক পাল্লায় ওজন করবে। এটি উত্তম, এর পরিণাম শুভ।' (সুরা বনি ইসরাইল : ৩৫)। যারা এতে ক্ষতিসাধন করে, কোরআনুল কারিমে তাদের জন্য রয়েছে ধ্বংসের কথা। রাসুল (সা.) বলেছেন, 'যে ব্যক্তি অন্য কারও ক্ষতিসাধন করে, আল্লাহতায়ালা তা দিয়েই তার ক্ষতিসাধন করেন। যে ব্যক্তি অন্যকে কষ্ট দেয়, আল্লাহতায়ালা তাকে কষ্টে ফেলেন।' (তিরমিজি : ১৯৪০)।

ক্রেতার সাথে কোমল ব্যবহার ব্যবসায়ের উন্নতির অন্যতম চাবিকাঠি। যারা কোমল আচরণ করে, ক্রেতার প্রতি সদয় থাকে, নবীজি (সা.) তাদের জন্য দোয়া করেছেন। রাসুল (সা.) বলেছেন, 'আল্লাহ তার প্রতি দয়া করুন, যে বিক্রির সময়, ক্রয়ের সময় এবং অভিযোগের সময় সদয় থাকে।' (বোখারি : ২০৭৬)। অনেকে মিথ্যা বলে বিক্রি করে এবং মিথ্যাকে জোরদার করার জন্য শপথ করে। অথচ মিথ্যাবাদীর ওপর আল্লাহর অভিশাপ। রাসুল (সা.) বলেছেন, 'কেয়ামত দিবসে আল্লাহতায়ালা তিন ব্যক্তির সঙ্গে কোনো ধরনের কথা বলবেন না, তাদের প্রতি ভ্রূক্ষেপ করবেন না, তাদের পবিত্র করবেন না। তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। তাদের একজন হলো, যে তার ব্যবসায়িক পণ্য মিথ্যা কসম খেয়ে বিক্রি করে।' (মুসলিম : ১০৬)।

সুদের কারবারও ইসলামে নিষিদ্ধ। অনেকে পণ্য দিয়ে দোকান ভর্তি করার জন্য সুদে টাকা নেয়, অথচ সুদ সম্পূর্ণ হারাম। নবীজি (সা.) বলেছেন, 'সুদ যদিও বৃদ্ধি পায়, কিন্তু এর শেষ পরিণতি হচ্ছে স্বল্পতা।' (সুনানে ইবনে মাজাহ : ২২৭৯)। আবার অনেকে নগদ বিক্রির সময় নির্ধারিত মূল্য রাখে; কিন্তু বাকিতে বিক্রির সময় অথবা কিস্তিতে বিক্রির সময় অতিরিক্ত টাকা রাখে। এটাও সুদ। আল্লাহতায়ালা বলেন, 'যারা সুদ খায়, তারা কেয়ামতের দিন দণ্ডায়মান হবে শয়তানের আসরে মোহাবিষ্টদের মতো। কারণ, তারা বলে, ব্যবসাও তো সুদের মতো। অথচ আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।' (সুরা বাকারা : ২৭৫)।

ব্যবসার ক্ষেত্রে ক্রেতাকে কোনো কিছু কিনতে বাধ্য করা যাবে না, কারণ সন্তুষ্টি ছাড়া কারো সম্পদ গ্রহণ করা হালাল নয়। আল্লাহতায়ালা বলেন, 'হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অপরের মাল অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। শুধু তোমাদের পরস্পরের সম্মতিক্রমে যে ব্যবসা করা হয়, তা বৈধ।' (সুরা নিসা : ২৯)। এছাড়া প্রতারণামূলক দালালি, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির জন্য খাদ্য মজুত রাখা এবং পণ্যে ভেজাল মিশ্রণ করা সম্পূর্ণ হারাম। রাসুল (সা.) বলেন, 'পাপী ব্যক্তিই মজুতদারি করে।' (মুসলিম : ১৬০৫)। এমন মজুতকারীর জন্য পরকালে রয়েছে যেমন শাস্তি, ইহকালেও রয়েছে এর জন্য তেমন চরম দুর্ভোগ, হতাশা ও যন্ত্রণা। রাসুল (সা.) বলেছেন, 'কেউ যদি খাদ্য গুদামজাত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে, আল্লাহ তাকে দুরারোগ্য ব্যাধি ও দারিদ্র্য দ্বারা শাস্তি দেন।' (সুনানে ইবনে মাজাহ : ২২৩৮)। এছাড়া রাসুল (সা.) বলেছেন, 'মুহাম্মদ-এর প্রাণ যাঁর হাতে, তাঁর কসম! তোমাদের কেউ পূর্ণ মোমিন হবে না, যতক্ষণ না সে নিজের ভাইয়ের জন্য তা পছন্দ করে, যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে থাকে।' (সুনানে নাসায়ি : ৫০১৭)।

ওজনে কম না দেওয়া : সঠিক ওজনে ক্রেতার কাছে পণ্য হস্তান্তর করা বিক্রেতার কর্তব্য। কোরআনুল কারিমে এ মর্মে বিভিন্ন জায়গায় নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আল্লাহতায়ালার নবী শুয়াইব (আ.) তার জাতিকে সঠিকভাবে পরিমাপের নির্দেশ দিয়েছেন। যারা ওজনে সঠিক পরিমাপ করে, তাদের জন্য রয়েছে ইহকাল ও পরকালে শুভ পরিণাম। আল্লাহতায়ালা বলেন, 'মেপে দেয়ার সময় পূর্ণ মেপে দেবে এবং সঠিক পাল্লায় ওজন করবে। এটি উত্তম, এর পরিণাম শুভ।' (সুরা বনি ইসরাইল : ৩৫)। যারা এতে ক্ষতিসাধন করে, কোরআনুল কারিমে তাদের জন্য রয়েছে ধ্বংসের কথা। আল্লাহতায়ালা বলেন, 'যারা পরিমাপে কম দেয়, তাদের জন্য ধ্বংস। যারা লোকদের কাছ থেকে মেপে নেয়ার সময় পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে; আর যখন তাদের মেপে দেয় অথবা ওজন করে দেয়, তখন কম দেয়।' (সুরা মুতাফফিফিন : ১-৩)। বেচাকেনার মাধ্যমে পরস্পরের হক সাব্যস্ত হয়। অনেক অসাধু ব্যবসায়ী ওজনে কম দেয়ার ফলে ক্রেতার হক নষ্ট করেন। রাসুল (সা.) বলেছেন, 'যে ব্যক্তি অন্য কারও ক্ষতিসাধন করে, আল্লাহতায়ালা তা দিয়েই তার ক্ষতিসাধন করেন। যে ব্যক্তি অন্যকে কষ্ট দেয়, আল্লাহতায়ালা তাকে কষ্টে ফেলেন।' (তিরমিজি : ১৯৪০)।

দালালি না করা : বাজারঘাটে এমন অনেক লোক আছে, যাদের পণ্য কেনার মোটেও ইচ্ছা নেই; কিন্তু অন্য লোকে যাতে ওই পণ্য বেশি দামে কিনতে উদ্বুদ্ধ হয়, সেজন্য পণ্যের পাশে ঘোরাঘুরি করে এবং দাম বাড়িয়ে বলতে থাকে। এটাই প্রতারণামূলক দালালি। রাসুল (সা.) বলেছেন, 'ক্রেতার ভান করে তোমরা পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিও না।' (মিশকাতুল মাসাবিহ : ৫০২৮)।