ঋণ গ্রহণ ও তা পরিশোধে ইসলামের সুস্পষ্ট নির্দেশনা ও সামাজিক আদব

প্রকাশিত: ৯:৪৭ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১৮, ২০২৬

বিশেষ কিংবা চরম প্রয়োজনে মানুষের থেকে ঋণ নেওয়া ইসলামে বৈধ হলেও অপ্রয়োজনে ধার করাকে চরম নিন্দনীয় হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। অতিরিক্ত ঋণের বোঝা সমাজে মানুষকে লাঞ্ছিত, অপদস্ত ও ধিকৃত করে তোলে। এমনকি এই মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে অনেকে আত্মহত্যার পথও বেছে নেয়। ইসলামি শরিয়তে ঋণকে মোমিনের জান্নাত লাভের অন্যতম অন্তরায় হিসেবে দেখানো হয়েছে। সে কারণেই রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পদ উত্তরাধিকারীদের মাঝে বণ্টনের পূর্বেই তার যাবতীয় ঋণ যেন শোধ করা হয় (সুনানে ইবনে মাজাহ : ২৪৩৩)। এমনকি শহিদের সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করা হলেও ঋণের দায় মাফ হয় না; হাদিসে এসেছে, 'ঋণ ছাড়া শহিদের সব গোনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।' (মুসলিম : ৪৭৭৭)।

ঋণের বোঝা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে নির্ধারিত সময়ে তা পরিশোধ করা আবশ্যক। ইসলামে লেনদেনের চুক্তি ও প্রতিশ্রুতি রক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম, যা ভঙ্গ করলে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নানা জটিলতার সৃষ্টি হয় এবং মানুষের পারস্পরিক আস্থা ও মানবিক মূল্যবোধ নষ্ট হয়। আল্লাহতায়ালা সুরা মায়িদার ১ নম্বর আয়াতে নির্দেশ দিয়েছেন, 'হে মোমিনরা, তোমরা অঙ্গীকারসমূহ পূর্ণ কর।' সুরা বনি ইসরাইলের ৩৪ নম্বর আয়াতে সতর্ক করে বলা হয়েছে, 'অঙ্গীকার পূর্ণ কর। অবশ্যই অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।' এছাড়া ওয়াদা খেলাফ করা মোনাফিকের লক্ষণ। সহিহ বোখারির ৩৩ নম্বর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, 'মোনাফিকের আলামত তিনটি— কথা বললে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে ভঙ্গ করে, আমানত রাখা হলে খেয়ানত করে।'

ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি যদি পাওনা আদায়ের সৎ নিয়ত রেখে আল্লাহর ওপর ভরসা করে আন্তরিক প্রচেষ্টা চালায়, তবে মহান আল্লাহ নিজেই তার ঋণ পরিশোধের পথ সহজ করে দেন। কোরআনে কারিমে বলা হয়েছে, 'যে কেউ আল্লাহর ওপর ভরসা করবে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট।' (সুরা তালাক : ৩)। রাসুল (সা.) এ প্রসঙ্গে বলেন, 'যে ব্যক্তি মানুষের মাল (ধার) নেয় পরিশোধ করার মানসে, আল্লাহ তা আদায়ের ব্যবস্থা করে দেন। আর যে তা নেয় বিনষ্ট (গ্রাস) করার নিয়তে, আল্লাহ তাকে ধ্বংস করেন।' (বোখারি : ২৩৮৭)।

দেনা শোধের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও অযথা সময়ক্ষেপণ বা গড়িমসি করাকে ইসলামে বড় ধরনের অন্যায় ও জুলুম হিসেবে ধরা হয়েছে। হাদিস শরিফে এসেছে, 'ধনী ব্যক্তির ঋণ পরিশোধে গড়িমসি করা জুলুম। যখন তোমাদের কাউকে (তার জন্য) কোনো ধনী ব্যক্তির হাওয়ালা করা হয়, তখন সে যেন তা মেনে নেয়।' (বোখারি : ২২৮৭)। তবে সর্বাত্মক চেষ্টা সত্ত্বেও নির্ধারিত সময়ে পাওনা মেটাতে অক্ষম হলে ঋণগ্রহীতা গুনাহগার হবেন না। এ ক্ষেত্রে তার প্রধান দায়িত্ব হলো পাওনাদারের কাছে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে নিজের অপারগতার কথা প্রকাশ করে পরিশোধের সময় বাড়িয়ে নেওয়া।

পাওনাদার যেহেতু বিপদের সময়ে ঋণ দিয়ে সাহায্য করেছেন, তাই উত্তম আচরণের প্রতিদান হিসেবে উৎকৃষ্ট পন্থায় তার ঋণ শোধ করা মানবিকতার দাবি। সুরা আর রহমানের ৬০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, 'উত্তম কাজের প্রতিদান উত্তম ছাড়া আর কী হতে পারে!' ঋণদাতার আচরণ কড়া হলেও তার সঙ্গে সদাচরণ করতে হবে এবং কোনো পূর্বশর্ত না থাকলে খুশি মনে তাকে কিছু অতিরিক্ত দেওয়াও প্রশংসনীয়। আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত এক হাদিসে পাওয়া যায়, এক ব্যক্তি রাসুল (সা.)-এর কাছে পাওনার তাগাদায় রূঢ় ভাষায় কথা বললে সাহাবিরা তাকে শাসন করতে উদ্যত হন। তখন নবীজি (সা.) তাদের থামিয়ে বলেন, 'তাকে ছেড়ে দাও। কেননা, পাওনাদারের (কড়া) কথা বলার অধিকার রয়েছে।' এরপর তিনি তার ঋণের সমবয়সী উট দেওয়ার নির্দেশ দেন। তা না পেয়ে উত্তম উট দিতে বললে সাহাবিরা তা-ই দেন। তখন রাসুল (সা.) মন্তব্য করেন, 'তোমাদের মধ্যে সে-ই সর্বোৎকৃষ্ট, যে ঋণ পরিশোধের বেলায় উত্তম।' (বোখারি : ২৩০৬)।

অনুরূপভাবে ঋণদাতার সঙ্গে সব পরিস্থিতিতে নম্র ও ভদ্র ব্যবহার করা মোমিনের নৈতিক দায়িত্ব। আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, এক গ্রামীণ ব্যক্তি রাসুল (সা.)-এর কাছে পাওনা আদায়ের জন্য কঠোর ভাষা ব্যবহার করে এমনকি নাজেহাল করার হুমকি দেয়। সাহাবিরা কড়া প্রতিবাদ জানালে নবীজি (সা.) তাদের বলেন, 'তোমরা কেন পাওনাদারের পক্ষ নিলে না?' এরপর তিনি কায়েসের কন্যা খাওলা (রা.)-এর কাছ থেকে খেজুর ধার নিয়ে সেই বেদুঈনের পাওনা শোধ করেন এবং তাকে আহার করান। লোকটির সন্তুষ্টির পর রাসুল (সা.) স্মরণ করিয়ে দেন, 'উত্তম লোকেরা এমনই হয়। যে জাতির দুর্বল লোকেরা জোর-জবরদস্তি ছাড়া তাদের পাওনা আদায় করতে পারে না, সে জাতি কখনও পবিত্র হতে পারে না।' (সুনানে ইবনে মাজাহ : ২৪২৬)।

বিপদের সময়ে ঋণ পাওয়া ও প্রয়োজন মেটা আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। তাই মহান রবের কৃজ্ঞতা প্রকাশের পাশাপাশি ঋণদাতার প্রতিও কৃতজ্ঞ হওয়া আবশ্যক। হাদিসে রাসুল (সা.) স্পষ্ট করেছেন, 'মানুষের প্রতি যে ব্যক্তি কৃতজ্ঞ নয়, আল্লাহর প্রতিও সে কৃতজ্ঞ নয়।' (তিরমিজি : ১৯৫৫)। নবীজি (সা.) নিজে কারও থেকে ধার নিলে তার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতেন ও দোয়া করতেন (সুনানে ইবনে মাজাহ : ২৪২৪)। কেউ উপকার করলে তাকে 'জাযাকাল্লাহু খাইরান' (আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন) বলে দোয়া করার দিকনির্দেশনা দিয়ে রাসুল (সা.) বলেন, এ বাক্যটি বললে উপকারীর উপযুক্ত ও পরিপূর্ণ প্রশংসা করা হয় (তিরমিজি : ২০৩৫)।