জুমার দিনে সূরা কাহাফ তিলাওয়াতের বিশেষ ফজিলত ও গুরুত্ব প্রকাশিত: ১০:১৩ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১৬, ২০২৬ মুসলিম উম্মাহর কাছে জুমার দিন সাপ্তাহিক ঈদের দিনের মতো মর্যাদাপূর্ণ। ইবাদত, দোয়া ও আল্লাহর রহমত লাভের এই বিশেষ দিনে মসজিদে মুসল্লিদের সমাগম ঘটে। এই বরকতময় দিনকে আরও তাৎপর্যময় করতে কোরআনের ১৮ নম্বর সূরা আল-কাহাফ তিলাওয়াত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল। হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, এই সূরা পাঠের মাধ্যমে দুই জুমার মধ্যবর্তী সময়ে বিশেষ নূর বা আলোর অধিকারী হওয়া যায়। এছাড়া সূরাটির শেষ ১০ আয়াত তিলাওয়াতের মাধ্যমে দাজ্জালের ফিতনা থেকে সুরক্ষা লাভের বিষয়টিও হাদিসে গুরুত্বের সঙ্গে বর্ণিত হয়েছে। তাঁর কাছে দুটি রশি দিয়ে একটি ঘোড়া বাঁধা ছিল। মেঘটি তাঁর কাছে আসতে থাকলে ঘোড়াটি ছোটাছুটি করতে শুরু করে। কোরআন তিলাওয়াত ও মুখস্থ করা ঈমানি চর্চার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সূরা ফাতিহা নামাজের জন্য অপরিহার্য। পবিত্র কোরআনের ১৫তম পারায় অবস্থিত এই সূরাটি মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে এবং এর মোট আয়াত সংখ্যা ১১০টি। এতে আসহাবে কাহাফের ঘটনা, দুই বাগানের মালিকের উপাখ্যান, হজরত মুসা (আ.) ও খিজির (আ.)-এর ঘটনা এবং জুলকারনাইনের বিবরণের মতো শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। এসব ঘটনা ঈমান, সম্পদ, জ্ঞান ও ক্ষমতার পরীক্ষার মাধ্যমে মানুষের জীবনের দিকনির্দেশনা প্রদান করে। হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি জুমার দিন সূরা কাহাফ তিলাওয়াত করবে, তার জন্য এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত নূর থাকবে। অন্য বর্ণনায় এটিকে পাঠকারীর জন্য বিশেষ আলোকবর্তিকা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। মক্কায় অবতীর্ণ এ সূরার আয়াত সংখ্যা ১১০। সকালে ওই ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে গিয়ে ঘটনাটি জানান। কোরআন তিলাওয়াতের সময় আল্লাহর রহমত ও প্রশান্তি বর্ষণের বহু ঘটনা রয়েছে। হজরত বারা ইবনে আজিব (রা.)-এর বর্ণনায় পাওয়া যায়, এক ব্যক্তি সূরা কাহাফ তিলাওয়াত করার সময় মেঘের মতো একটি প্রশান্তি বা ‘সাকিনা’ তাঁকে ঢেকে ফেলেছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই ঘটনা শুনে নিশ্চিত করেন যে, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ রহমত যা কোরআন পাঠের বরকতে নাজিল হয়েছিল। আরেকটি বর্ণনায় দেখা যায়, একই সাহাবি সূরা পাঠ করার সময় তাঁর বাড়ির চতুষ্পদ প্রাণীটি অস্থির হয়ে উঠেছিল এবং মেঘের ছায়া তাকে আবৃত করে রেখেছিল। নবীজি (সা.) তাকে সেই সূরাটিই পাঠ করতে উৎসাহিত করেছিলেন। তিনি সালাম দিলে কুয়াশা বা একখণ্ড মেঘ তাঁকে আবৃত করে। দাজ্জালের ফিতনা থেকে আত্মরক্ষার বিষয়টি সূরা কাহাফের অন্যতম বড় ফজিলত। রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, কিয়ামত পর্যন্ত দাজ্জালের চেয়ে বড় কোনো ফিতনা নেই। তাই সূরাটি যেভাবে নাজিল হয়েছে সেভাবে পাঠ করলে নিজের অবস্থান থেকে মক্কা পর্যন্ত আলো হওয়ার কথা হাদিসে এসেছে। বিশেষ করে শেষ ১০ আয়াত তিলাওয়াতকারীকে দাজ্জালের প্রভাব থেকে সুরক্ষিত রাখবে। হজরত ইবনে উমর (রা.)-এর বর্ণনায় রয়েছে, যে ব্যক্তি শুক্রবার এটি পাঠ করবে, তার পা থেকে আকাশের উচ্চতা পর্যন্ত নূর বিস্তৃত হবে এবং আগের জুমা থেকে বর্তমান জুমার মধ্যবর্তী গুনাহসমূহ ক্ষমা করা হবে। সূরাটির প্রথম আয়াতে আল্লাহর প্রশংসা এবং তাঁর বান্দার প্রতি কিতাব অবতীর্ণ করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। দশম আয়াতে আসহাবে কাহাফের যুবকদের দোয়া স্থান পেয়েছে—‘হে আমাদের প্রতিপালক, আপনি নিজ থেকে আমাদের অনুগ্রহ দান করুন এবং আমাদের কাজকর্ম সঠিকভাবে পরিচালনার ব্যবস্থা করুন।’ এছাড়া চতুর্থ ও পঞ্চম আয়াতে সন্তান গ্রহণের দাবির অসারতা ও মিথ্যাচারের ভয়াবহতা তুলে ধরা হয়েছে। ষষ্ঠ আয়াতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি সান্ত্বনা বাণী প্রদান করা হয়েছে, যাতে তিনি অবিশ্বাসের দুঃখে নিজেকে নিঃশেষ না করেন। মানুষ এ বাণীতে বিশ্বাস না করলে তাদের পেছনে পেছনে ঘুরে দুঃখে নিজেকে শেষ করে ফেলতে পারেন, এমন ভাবনা থেকে তাঁকে বিরত থাকার বার্তা দেওয়া হয়েছে। সূরা কাহাফের বিভিন্ন অংশে ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষা রয়েছে। যেমন, আসহাবে কাহাফের ঘটনায় ধর্মবিশ্বাসের পরীক্ষা, দুই বাগানের মালিকের ঘটনায় সম্পদের পরীক্ষা, মুসা (আ.) ও খিজির (আ.)-এর ঘটনায় জ্ঞানের পরীক্ষা এবং জুলকারনাইনের ঘটনায় ক্ষমতার পরীক্ষার শিক্ষা পাওয়া যায়। এছাড়া দাওয়াতের প্রসঙ্গে ১৪ নম্বর আয়াতে যুবকদের বাদশাহর কাছে, ৩৭ নম্বর আয়াতে সঙ্গীর প্রতি এবং ৭০ নম্বর আয়াতে শিক্ষক ও ছাত্রের সম্পর্কের শিক্ষা রয়েছে। ৮৭ ও ৮৮ নম্বর আয়াতে জুলকারনাইনের ঘটনায় শাসক ও প্রজাদের সম্পর্কের বিষয়টি ফুটে উঠেছে। সূরাটির ১-৮ আয়াতে মূল বক্তব্য, ৯-২৬ আয়াতে আসহাবে কাহাফ, ২৭-৩১ আয়াতে উপদেশ, ৩২-৪৪ আয়াতে বাগানের মালিকের ঘটনা এবং ৪৫-৫৯ আয়াতে দীর্ঘ শিক্ষা রয়েছে। আল্লাহ তাআলা সূরাটির সপ্তম আয়াতে বলেছেন, ‘পৃথিবীর ওপর যা কিছু আছে, আমি সেগুলোকে তার শোভা করেছি, মানুষকে পরীক্ষা করার জন্য যে, তাদের মধ্যে কে কর্মে উত্তম।’ এই আয়াতের শিক্ষা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োগ করা প্রয়োজন। জুমার দিনের আমল হিসেবে বৃহস্পতিবার সূর্যাস্তের পর থেকে শুক্রবার সূর্যাস্তের যেকোনো সময় সূরা কাহাফ পাঠ করা যায়। পুরো সূরা এক বৈঠকে পড়া জরুরি নয়, বরং একাধিক বৈঠকে ভাগ করে পড়ার সুযোগ রয়েছে। যারা পুরোটা পড়তে অক্ষম, তারা প্রথম ১০ আয়াত অথবা শেষ ১০ আয়াত তিলাওয়াত করতে পারেন। জুমার দিনকে আত্মশুদ্ধির সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়ে অর্থ ও শিক্ষা বোঝার চেষ্টা করা প্রতিটি মুমিনের জন্য কল্যাণকর। তাদের মুখ থেকে গুরুতর কথা বের হয়, তারা মিথ্যা ছাড়া কিছু বলে না। (সূরা কাহাফ, আয়াত ৪-৫)। দৈনন্দিন আমলে চার কুল, সূরা ইয়াসিন, সূরা ওয়াকিয়া, সূরা মুলক ও সাপ্তাহিক সূরা আল-কাহাফের মতো সূরা শুদ্ধভাবে শেখার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। আল্লাহ বলেন, ‘পৃথিবীর ওপর যা কিছু আছে, আমি সেগুলোকে তার শোভা করেছি, মানুষকে পরীক্ষা করার জন্য যে, তাদের মধ্যে কে কর্মে উত্তম।’ (সূরা কাহাফ, আয়াত ৭)। SHARES ইসলাম বিষয়: ইসলামিক আমলকুরআনজুমার দিনদাজ্জালের ফিতনাফজিলতসূরা কাহাফ