স্ত্রীর প্রশংসা দিবস আজ: দাম্পত্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের বিশেষ দিন

প্রকাশিত: ৪:১৫ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬

সংসার একটি সুবিশাল ক্যানভাস, আর সেখানে স্ত্রীর ভূমিকা এক অদৃশ্য অথচ অসামান্য শিল্পীর মতো। প্রতিদিনের ব্যস্ততা, কাজের চাপ এবং জীবনের হাজারো ধকলের মাঝে সবচেয়ে সহজ যে বিষয়টি মানুষ ভুলে যায়, তা হলো নিকটতম মানুষটিকে একটু ধন্যবাদ জানানো। সম্পর্কের এই স্বাভাবিক নিয়মকে নতুন করে মনে করিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই বিশ্বজুড়ে উদযাপিত হয় ‘স্ত্রীর প্রশংসা দিবস’ (Wife Appreciation Day)। প্রতি বছর সেপ্টেম্বরের তৃতীয় রবিবার বিশ্বজুড়ে এই দিনটি বিশেষ ভালোবাসায় ও শ্রদ্ধায় পালিত হয়ে আসছে।

সংসার শুধু দায়িত্ব আর ব্যস্ততার নাম নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ভালোবাসা, যত্ন, ত্যাগ ও একসঙ্গে পথচলার গল্প। পরিবারের সবার যত্ন নেওয়া থেকে শুরু করে কঠিন সময়ে পাশে থাকা—একজন স্ত্রীর অনেক অবদানই প্রতিদিনের ব্যস্ততায় আলাদা করে বলা হয়ে ওঠে না। তাই প্রিয় মানুষটিকে থেমে গিয়ে বলা—‘তুমি আমার জীবনে খুব গুরুত্বপূর্ণ’—হতে পারে ভালোবাসার অনন্য প্রকাশ। সেই উপলক্ষই ‘স্ত্রীর প্রশংসা দিবস’, যা মনে করিয়ে দেয়—ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার প্রকাশ শুধু একদিন নয়, প্রতিদিনই হওয়া উচিত। দৈনন্দিন জীবনের একঘেয়েমি কাটিয়ে একজন স্ত্রীর অমূল্য অবদান, অফুরন্ত ভালোবাসা এবং নিরবচ্ছিন্ন আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোই এই দিবসের মূল মন্ত্র। ২০০৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে এই উদযাপনের যাত্রা শুরু হলেও আজ বিশ্বজুড়ে এর পরিধি বিস্তৃত।

দিবসটি নির্দিষ্ট কোনো একক ব্যক্তি বা ব্র্যান্ডের মাধ্যমে শুরু হয়নি; বরং এটি সমাজের মনস্তাত্ত্বিক ও পারিবারিক চাহিদার ফল হিসেবে গড়ে ওঠে। আধুনিক যুগে কর্মক্ষেত্র এবং গৃহস্থালি—উভয় ক্ষেত্রেই একজন নারী যেভাবে সামঞ্জস্য বজায় রেখে কাজ করেন, সেটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মান জানানোর একটি মাধ্যম প্রয়োজন ছিল। একটি পরিবারকে গুছিয়ে রাখা, সুন্দর পরিবেশ বজায় রাখা এবং পরিবারের প্রতিটি সদস্যের মানসিক ও শারীরিক যত্ন নেওয়ার ক্ষেত্রে স্ত্রীর অবদান অপরিসীম। সমাজে প্রায়শই স্ত্রীর এই কাজগুলোকে "দায়িত্ব" হিসেবে গণ্য করে স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া হয়, যা মানসিক ও সামাজিকভাবে অনুচিত।

সংসার পরিচালনার পেছনে এমন হাজারো ছোট ছোট কাজ থাকে যা চোখে পড়ে না, অথচ না করলে পুরো পরিবার স্থবির হয়ে পড়ে। সকালের খাবার প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে ঘর গুছিয়ে রাখা, সন্তানদের লালন-পালন, প্রবীণ সদস্যদের যত্ন এবং পরিবারের প্রতি মাসের বাজেট সামলানো—এই সবকিছুতেই একজন স্ত্রীর হাতের ছোঁয়া থাকে। একে বলা যায় অদৃশ্য গৃহস্থালি শ্রম। এর পাশাপাশি নারীরা পরিবার পরিচালনার মানসিক নীরব ভারও একা বহন করেন। কাকে কখন ডাক্তারের কাছে নিতে হবে, কার কী ওষুধ লাগবে, গৃহস্থালির কী কেনাকাটা বাকি—এই অদৃশ্য মানসিক চাপ একজন নারী প্রতিনিয়ত বহন করে চলেন। অনেক নারীই সংসারের প্রয়োজনে বা সন্তানদের সুস্বাস্থ্যের কথা ভেবে নিজের সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ার, স্বপ্ন কিংবা ব্যক্তিগত শখ বিসর্জন দেন। আবার যারা পেশাগত জীবনে সমানভাবে সক্রিয়, তারা ঘরে-বাইরে ডাবল শিফটে কাজ করেন। এই ত্যাগ ও পরিশ্রমের সঠিক মূল্য দেওয়া প্রতিটি স্বামীর মৌলিক দায়িত্ব।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, যেকোনো স্থায়ী ও সুস্থ সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক সম্মান ও প্রশংসা। দীর্ঘ বিবাহিত জীবনে কাজের একঘেয়েমি এবং বোঝাপড়ার অভাব অনেক সময় দূরত্বের সৃষ্টি করে। নিয়মিত প্রশংসায় একজন মানুষ নিজেকে মূল্যায়ন করতে শেখেন। যখন একজন স্ত্রী জানতে পারেন যে তার পরিশ্রম ও যত্নের মূল্য দেওয়া হচ্ছে, তখন তার মানসিক তৃপ্তি বহুগুণ বেড়ে যায়। বৈবাহিক সম্পর্কে মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশংসার চেয়ে বড় কোনো প্রতিষেধক নেই। প্রশংসা সম্পর্কের ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভ ও অবসাদ দূর করতে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব দম্পতি পরস্পরের কাজের প্রশংসা করেন এবং ছোট ছোট বিষয়েও ধন্যবাদ জানান, তাদের দাম্পত্য জীবনের স্থায়িত্ব ও সুখের মাত্রা অন্য অনেকের চেয়ে বেশি।

স্ত্রীর প্রশংসা দিবস মানেই অনেক বড় আয়োজন বা মূল্যবান উপহার দিতে হবে—এমন নয়। অনুভূতির আন্তরিক প্রকাশই এই দিনের মূল চালিকাশক্তি। ব্যস্ত জীবনের মাঝেও স্ত্রীর জন্য এই দিনটিকে স্মরণীয় করে তোলার কয়েকটি চমৎকার উপায় রয়েছে। চোখ দেখে একটি আন্তরিক "ধন্যবাদ" বা "তুমি আছ বলেই আমার জীবনটা এত সুন্দর" বলা অনেক দামী উপহারের চেয়েও শক্তিশালী। ডিজিটাল যুগে হাতে লেখা চিঠির আবেদন আলাদা। তার প্রতি আপনার অনুভূতি, ভালোবাসার স্মৃতি এবং তার ত্যাগের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে একটি ছোট চিঠি লিখতে পারেন। এছাড়া রান্নাঘরে সাহায্য করা, ঘর পরিষ্কার করা, সন্তানদের সামলানো বা অন্যান্য কাজ নিজে করে স্ত্রীকে সম্পূর্ণ বিশ্রামের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। দৈনন্দিন সংসারের আলোচনা, সন্তান বা কাজের কথা দূরে সরিয়ে রেখে কেবল নিজেদের জন্য কিছুটা গুণমানসম্পন্ন সময় বের করা, কাছাকাছি কোথাও ঘুরতে যাওয়া, পার্ক বা কোনো শান্ত জায়গায় হেঁটে পুরোনো স্মৃতি রোমন্থন করা সম্পর্কের রসায়নকে নতুন করে সতেজ করে তোলে। স্ত্রীর হারিয়ে যাওয়া কোনো শখ বা ইচ্ছে পূরণে তাকে উৎসাহিত করা ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়াও ভালোবাসার এক অনন্য প্রকাশ।

আমাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে দাম্পত্য সম্পর্কের মাধুর্য নিয়ে আলোচনার সুযোগ অনেক সময় কমে যায়। অথচ বাঙালি সংস্কৃতিতে পরিবারব্যবস্থার মূল স্তম্ভই হলেন নারী। প্রাচ্যের পরিবারগুলোতে স্ত্রীর ভূমিকা কেবল একজন সঙ্গীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, তিনি পুরো পরিবারের আত্মাস্বরূপ। ধর্মীয় দৃষ্টি থেকেও স্ত্রীকে সম্মান দেওয়া ও তার প্রশংসা করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। ইসলাম ধর্মে স্ত্রীর সঙ্গে সর্বোত্তম আচরণের ওপর অত্যন্ত জোর দেওয়া হয়েছে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, "তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই উত্তম, যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম।" দাম্পত্য জীবনে স্ত্রীর অবদানকে স্বীকার করা এবং তাকে ভালোবাসা প্রকাশ করা সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত। বর্তমান সমাজে পুরুষরা ধীরে ধীরে তাদের ঐতিহ্যগত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেরিয়ে আসছেন। ঘরে স্ত্রীর কাজে সাহায্য করা বা প্রকাশ্যে স্ত্রীর প্রশংসা করাকে এখন আর দুর্বলতা নয়, বরং একজন প্রবুদ্ধ ও আধুনিক পুরুষের গুণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

তবে ‘স্ত্রীর প্রশংসা দিবস’ উদযাপনের একটি চমৎকার দিক হলো এটি আমাদের একটি স্মারক বা স্মরণিকা হিসেবে কাজ করে। তবে বছরের একটি মাত্র নির্দিষ্ট দিনে সীমাবদ্ধ থাকলে এই দিবসের প্রকৃত উদ্দেশ্য অর্জিত হয় না। সেপ্টেম্বরের এই বিশেষ রবিবারটি হতে পারে একটি নতুন অভ্যাসের সূচনা। এই দিনটিতে যে ভালোবাসার অঙ্গীকার করা হবে, তা যেন বছরের বাকি ৩৬৪ দিনেও বজায় থাকে। "প্রশংসা হলো সেই বাতাস, যা সম্পর্কের ভালোবাসার প্রদীপকে প্রতিনিয়ত জ্বলতে সাহায্য করে।" প্রতিদিনের জীবনে ছোট ছোট কিছু কাজ নিয়মিত করা যেতে পারে, যেমন কাজের মাঝে হঠাৎ একটি সংক্ষিপ্ত বার্তা পাঠানো ("তোমার কথা মনে পড়ছে"), নতুন পোশাক পরলে বা সুন্দর সাজলে তার প্রশংসা করা এবং দিনশেষে সে কেমন ছিল তা জানতে চাওয়া এবং মন দিয়ে তার কথা শোনা।

একটি সফল দাম্পত্য জীবন কোনো অলৌকিক বিষয় নয়; এটি দুটি মানুষের পারস্পরিক যত্ন, সহমর্মিতা এবং ভালোবাসার ফসল। ব্যস্ত এই পৃথিবীতে সম্পর্কের সুতাগুলো অনেক সময়ই আলগা হয়ে পড়ে। 'স্ত্রীর প্রশংসা দিবস' সেই সুতাগুলোকে আবার শক্ত করে বাঁধার একটি দারুণ সুযোগ এনে দেয়। আজ এই বিশেষ দিনে সমাজের সকল পুরুষদের উচিত তাদের জীবনসঙ্গিনীর চোখের দিকে তাকিয়ে হৃদয়ের অন্তস্তল থেকে বলা—"তোমার উপস্থিতির জন্য ধন্যবাদ, তুমি আমার জীবনকে সম্পূর্ণ করেছ।"

পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতামূলক এই বিশেষ প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ বুলেটিন-এর সম্পাদক ও প্রকাশক আবুল হাসান মো: আল ফারুকা। ঢাকার কাওরান বাজারের ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫ ঠিকানায় অবস্থিত কার্যালয় থেকে এটি প্রচারিত হয়। যেকোনো সংবাদ বা বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করা যাবে নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599 এবং ই-মেইল: [email protected] ঠিকানায়। বাংলাদেশ বুলেটিন-এর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত কপিরাইট © নিয়মে এই তথ্যগুলো জানানো হয়েছে।

​১. অদৃশ্য গৃহস্থালি শ্রম: ​সংসার পরিচালনার পেছনে এমন হাজারো ছোট ছোট কাজ থাকে যা চোখে পড়ে না, অথচ না করলে পুরো পরিবার স্থবির হয়ে পড়ে। সকালের খাবার প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে ঘর গুছিয়ে রাখা, সন্তানদের লালন-পালন, প্রবীণ সদস্যদের যত্ন এবং পরিবারের প্রতি মাসের বাজেট সামলানো—এই সবকিছুতেই একজন স্ত্রীর হাতের ছোঁয়া থাকে।

​২. মানসিক নীরব ভার: ​নারীরা শুধু শারীরিক কাজই করেন না, পরিবার পরিচালনার মানসিক পরিকল্পনাও একা বহন করেন। কাকে কখন ডাক্তারের কাছে নিতে হবে, কার কী ওষুধ লাগবে, গৃহস্থালির কী কেনাকাটা বাকি—এই অদৃশ্য মানসিক চাপ একজন নারী প্রতিনিয়ত বহন করে চলেন।