গ্যাস সংকটে পেট্রোনাসের ১০০ টাকা দরে এলএনজি বিক্রির প্রস্তাব

প্রকাশিত: 11:01 AM, July 28, 2026

সারা দেশে তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে জনজীবন ও শিল্পখাত চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চুলা জ্বলছে না এবং সিএনজি পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েও গ্যাস মিলছে না। এই সংকটের মধ্যে মালয়েশিয়ার তেল ও গ্যাস কোম্পানি পেট্রোনাস একটি নতুন প্রস্তাব নিয়ে এসেছে। তারা আইএসও (ISO) বা ক্রোয়োজেনিক লরি ট্যাংকার পদ্ধতিতে বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে। তবে তাদের প্রস্তাবিত দাম প্রতি ইউনিট ১০০ টাকা, যা বর্তমান বাজারদরের তুলনায় অনেক বেশি।

পেট্রোনাসের একটি প্রতিনিধিদল সম্প্রতি সরকারি সংস্থা পেট্রোবাংলায় বিজিএমইএ, বিকেএমইএ এবং বিটিএমএ’র প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে এই প্রস্তাব পেশ করে। পেট্রোনাসের মহাব্যবস্থাপক নরহামিজাম বিন নরদিন নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদলটি আজ মঙ্গলবার নারায়ণগঞ্জের ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র ও একটি বেসরকারি সুগার মিল পরিদর্শন করবে, যেখানে তারা আইএসও পদ্ধতিতে গ্যাস সরবরাহের সম্ভাবনা যাচাই করবে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, মালয়েশিয়া থেকে জাহাজে করে কনটেইনারের মতো ট্যাংকে এলএনজি আনা হবে। প্রতিটি জাহাজে ৬০০-এর মতো ট্যাংক থাকবে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে এই ট্যাংকগুলো লরির মাধ্যমে পাইপলাইন বা কারখানায় নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজস্ব রিজার্ভ ট্যাংক ও রিগ্যাসিফিকেশন স্থাপনা বসাতে হবে, যার জন্য বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। পেট্রোনাস জানিয়েছে, ট্যাংকারে ওই এলএনজি চট্টগ্রাম বন্দরে আসতে সময় লাগে প্রায় ৭ দিন।

বর্তমানে সরকার শিল্প গ্রাহকদের কাছে ৩১ টাকা দরে গ্যাস বিক্রি করছে। পেট্রোবাংলাকে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে প্রতি ইউনিট ৬৬ টাকায়, যা মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। গত বছর এলএনজি খাতে সরকারের ব্যয় ছিল ৪৫ হাজার কোটি টাকা, যা এবার ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে প্রতি ইউনিট ১০০ টাকা মূল্যে গ্যাস কেনা শিল্পমালিকদের জন্য কঠিন বলে মনে করছেন বিটিএমএ প্রতিনিধি রাজীব হায়দার। তিনি জানান, দেশে চরম গ্যাস সংকট থাকায় সবাই গ্যাসের ব্যাপারে আগ্রহী হলেও এই উচ্চমূল্যে কেনা কঠিন।

গ্যাসের অভাবে বর্তমানে ৬ হাজারের বেশি মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হচ্ছে এবং বিকল্প হিসেবে ফার্নেস অয়েল ব্যবহার করতে গিয়ে প্রতি ইউনিটের খরচ ২৫ টাকার বেশি পড়ছে। এছাড়া গত ৫ বছরে ৫৫০টি শিল্পকারখানা ডিমান্ড নোটের টাকা জমা দিয়েও গ্যাস সংযোগ পায়নি। পেট্রোনাসের এই প্রস্তাবের বিষয়ে সরকার এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া সফরকালে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে জ্বালানি খাতে স্বাক্ষরিত সমঝোতা চুক্তির (এমওইউ) আওতায় এই প্রস্তাবটি এসেছে।

সারা দেশে গ্যাসের জন্য হাহাকার চলছে। সিএনজি পাম্পে গ্যাস না থাকার পরও পাম্পগুলোর সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকছে শত শত প্রাইভেটকার ও সিএনজি অটোরিকশা। বাসার গ্যাসের চুলাগুলোও বন্ধ। শিল্পকারখানার চাকা ঘুরছে না। গ্যাসের অভাবে কয়েক হাজার শিল্প চরম সংকটের মুখে। দু-চার দিনের মধ্যে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি টার্মিনাল চালুর কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। কবে চালু হবে তাও জানে না কেউ। এই অনিশ্চিত অবস্থায় মালয়েশিয়ার তেল ও গ্যাস কোম্পানি পেট্রোনাস ক্রোয়োজেনিক লরি ট্যাংকার বা আইএসও পদ্ধতিতে গ্যাস সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার এবং দেশের শিল্পমালিকদের। তারা প্রতি ইউনিট গ্যাসের মূল্য ৩১ টাকার বদলে ১০০ টাকা করে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। পেট্রোনাস জানিয়েছে, আইএসও পদ্ধতিতে ৭-১০ দিনের মধ্যে মালয়েশিয়া থেকে গ্যাস এনে বাংলাদেশের শিল্পে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) সরবরাহ করা সম্ভব। মূল্য বেশি হলেও এতে বাংলাদেশের চলমান গ্যাসের সংকট কিছুটা হলেও কাটবে। পেট্রোনাসের একটি প্রতিনিধিদল গতকাল সরকারি সংস্থা পেট্রোবাংলায় গিয়ে আইএসও পদ্ধতিতে এলএনজি বিক্রির প্রস্তাব দেয়। সেখানে আয়োজিত বৈঠকে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ এবং বিটিএমএ’র প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।