মোদির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ‘ককরোচ জনতা পার্টি’, তরুণদের ক্ষোভকে কাজে লাগাতে চায় বিরোধীরা প্রকাশিত: ১০:৩৫ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২২, ২০২৬ ভারতে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)’ আন্দোলন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকারের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে এই আন্দোলনকে ঘিরে দেশটির বিরোধী দলগুলোর সামনে তৈরি হয়েছে নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনা। গত মে মাসে তরুণদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের ওপর ভর করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে সিজেপি। সে সময় দলটির প্রতিষ্ঠাতা স্পষ্ট করেই বলেছিলেন, তাদের সমর্থকেরা শুধু মোদি সরকারের ওপরই নয়, বরং বিরোধী দলগুলোর ওপর থেকেও আস্থা হারিয়েছেন। কারণ কোনো পক্ষই তাদের সংকটের কার্যকর সমাধান দিতে পারেনি। তবে গত সোমবার দিল্লিতে সংসদ অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিল করার সময় পরিস্থিতি বদলে যায়। পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দিলে সিজেপি নেতারা সরাসরি বিরোধী দলগুলোর আইনপ্রণেতাদের কাছে সমর্থনের আহ্বান জানান। পুলিশের এই কঠোর অভিযানে বহু শিক্ষার্থী আহত হওয়ার পরদিনই বিরোধী নেতারা দলমত নির্বিশেষে এই আন্দোলনের পাশে এসে দাঁড়ান। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করা বিরোধী দলগুলোর জন্য তরুণ ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর একটি বড় সুযোগ হতে পারে। এর ফলে সিজেপির এই আন্দোলনও আরও বড় পরিসরে জাতীয় সমর্থন পেতে পারে। এ পর্যন্ত সিজেপির মূল আন্দোলনটি ছিল প্রশ্নপত্র ফাঁসের দায়ে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে। সোমবার দিল্লির সেই বিক্ষোভে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। পুলিশের দমনপীড়নের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর প্রায় সব বিরোধী দলই আন্দোলনের প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করে। যদিও সিজেপি এখন পর্যন্ত পরিষ্কার করে জানিয়েছে যে, তারা কোনো ধরনের নির্বাচনী রাজনীতিতে অংশ নেবে না। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, বিরোধী দলগুলোর সমর্থন এই আন্দোলনের জন্য সাংগঠনিক শক্তি ও জাতীয় পরিচিতি এনে দিলেও এর পেছনে একটি বড় ঝুঁকিও রয়েছে। শিক্ষার্থীদের মূল দাবি—প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ করা এবং তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা—বৃহত্তর রাজনৈতিক এজেন্ডার আড়ালে ঢাকা পড়ে যেতে পারে। ২০১৪ সালে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের ঢেউয়ে চড়ে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকে প্রতিটি নির্বাচনেই বিরোধীরা তার কাছে পরাজিত হয়েছে। ভারতের ১৪২ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশির বয়স ৩০ বছরের নিচে। দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ায় এই তরুণদের মধ্যে ক্ষোভ ক্রমেই বাড়ছে। আগামী ২০২৯ সালের এপ্রিলের মধ্যে পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও, তার আগেই আগামী বছর উত্তর প্রদেশ ও পাঞ্জাবের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলোতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। দিল্লির সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব ডেভেলপিং সোসাইটিজের অধ্যাপক সঞ্জয় কুমার মনে করেন, এই ইস্যুতে সরকারের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী জনমত তৈরি হয়েছে এবং বিরোধীরা সেটি বুঝতে পেরেছে। তিনি আরও বলেন, আন্দোলনের যদি কোনো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা না থাকে, তবে সরকারের পক্ষ থেকে আরও কঠোর দমনপীড়নের আশঙ্কা থাকে। তাই বিরোধী দলগুলো এটিকে একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখছে এবং আন্দোলনকারীদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করছে। অন্যদিকে, সরকারপন্থী বেশ কিছু ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইতিমধ্যে অভিযোগ তুলেছে যে, বিরোধী দলগুলো রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে এই আন্দোলনকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছে। এরই ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার রাতে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্র প্রধানমন্ত্রী মোদির বাসভবনের সামনে বিক্ষোভে অংশ নেন এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের দায়ে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করেন। পুলিশের হাতে আটক হওয়ার আগে রাহুল গান্ধী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালানো মানে ভারতের প্রতিটি পরিবারের ওপর হামলা করা। প্রধানমন্ত্রী মোদি মনে করছেন কোনো জবাবদিহি ছাড়াই তিনি পার পেয়ে যাবেন, কিন্তু এবার তা হতে দেওয়া হবে না। ভারতের শিক্ষার্থীদের কণ্ঠকে এভাবে উপেক্ষা করা যাবে না। অবশ্য প্রধানমন্ত্রী মোদি এখনো এই প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে মন্ত্রিসভার এক সদস্য জানিয়েছেন, শাসক জোটের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যে শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষায় সর্বোচ্চ কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক রশিদ কিদওয়াইয়ের মতে, ভারতের তরুণদের সবচেয়ে বড় শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে নিজেদের তুলে ধরার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এখন এক ধরনের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে উত্তর প্রদেশ ও পাঞ্জাবের আসন্ন নির্বাচনের হিসাব-নিকাশ মাথায় রেখেই দলগুলো এই রাজনৈতিক চাল চালছে। তবে সিজেপির এক মুখপাত্র স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, এটি কোনো রাজনৈতিক বিক্ষোভ নয়, বরং সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীদের একটি আন্দোলন। তারা বিরোধীদের সমর্থনকে স্বাগত জানালেও আন্দোলনের মঞ্চে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে দেবেন না। অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক সন্দীপ শাস্ত্রী সতর্ক করে বলেছেন, যেকোনো আলোচিত আন্দোলনে রাজনৈতিক দলগুলোর যুক্ত হওয়ার তীব্র প্রলোভন থাকে, কিন্তু তারা বেশি সক্রিয় হয়ে উঠলে আন্দোলনের মূল উদ্যোক্তা ও প্রকৃত দাবিগুলো শেষ পর্যন্ত হারিয়ে যেতে পারে। SHARES অন্যান্য বিষয়: ককরোচ জনতা পার্টিনরেন্দ্র মোদিপ্রশ্নপত্র ফাঁসভারতের রাজনীতিরাহুল গান্ধীশিক্ষার্থী আন্দোলন