ভারতে বসে নিজের পালানোর গল্প শোনালেন আওয়ামী লীগ নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানক প্রকাশিত: ৪:১৬ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১২, ২০২৬ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে ভারতে আত্মগোপনে রয়েছেন দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য, তিনবারের সাবেক সংসদ সদস্য ও দুবারের সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক। সম্প্রতি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজার পত্রিকার মুখোমুখি হয়ে তিনি তাঁর আত্মগোপন, সীমান্ত পাড়ি দেওয়া এবং দলের ভবিষ্যৎ রাজনীতি নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন। আত্মগোপনের ইতিহাস তাঁর জীবনে নতুন নয় উল্লেখ করে নানক বলেন, ১৯৬৯ সালে স্কুল জীবনে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে তাঁর রাজনীতি শুরু। ১৯৭১ সালে তিনি ভারতে গিয়ে ট্রেনিং নেন এবং মুজিব বাহিনীর সদস্য হিসেবে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেন। এরপর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর যে অশুভ ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির যাত্রা শুরু হয়েছিল, তখন থেকেই তাঁদের আত্মগোপনে জীবন কাটাতে হয়েছে। পরবর্তীতে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলেও তাঁকে আত্মগোপনে থেকে দলের কাজ করতে হয়েছে। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙা এবং ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে। নানক বলেন, এই দৃশ্য দেখার আগে যদি তাঁর মৃত্যু হতো, তবে সেটি শান্তির মৃত্যু হতো। তাঁর মতে, মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত শক্তিরা এখন প্রতিশোধ নিচ্ছে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান করছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, গত দুই বছর ধরে তিনি তাঁর ছেলের কবর এবং মা-বাবার কবরের কাছে যেতে পারছেন না। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে পাকিস্তানপন্থী ও স্বাধীনতাবিরোধী আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, তারা বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তান বানাতে চায়। নিজের পালানোর রোমাঞ্চকর বিবরণ দিয়ে নানক জানান, ৪ আগস্ট দিবাগত রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত তিনি গণভবনে ছিলেন। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর তিনি তাঁর শোয়ার জায়গায় প্রায় অচেতন হয়ে পড়েছিলেন। পরে বিমানবাহিনীতে কর্মরত এক নিকটাত্মীয়ের মাধ্যমে জানতে পারেন যে নেত্রী নিরাপদে সীমান্ত পার হয়েছেন। এরপর তিনি একের পর এক আশ্রয় পরিবর্তন করেন এবং ব্যবহৃত ফোনগুলো ফেলে দেন। একপর্যায়ে তাঁর চিকিৎসক জামাতার দিকনির্দেশনা ও সহায়তায় তিনি দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। ৫ আগস্টের ঘটনার পর ১৬ আগস্ট তিনি ভারতের শিলংয়ে পৌঁছান। সেখান থেকে মালদহে আশ্রয় নেওয়া তাঁর মেয়ে ও নাতি-নাতনিদের কাছে যান এবং পরের দিন কলকাতায় চলে আসেন। শেখ হাসিনার দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে নানক বলেন, সেদিন যদি তিনি ৩০ মিনিট দেরি করতেন, তবে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হতো। ভারতে শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছে এবং তিনি সেখানে ভালো আছেন। ভারত সরকার তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর প্রোটোকলেই নিরাপত্তা দিচ্ছে। সম্প্রতি টেলিফোনে শেখ হাসিনা তাঁকে জানিয়েছেন যে, গত দুই বছরে মাত্র দুদিন সর্দি লাগা ছাড়া তাঁর কোনো ওষুধ খেতে হয়নি। সরকারের পতনকে একটি গভীর বা 'ডিপ স্টেট' ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যায়িত করে নানক বলেন, শেখ হাসিনা ছয় মাস আগেই শ্বেতাঙ্গদের ষড়যন্ত্র এবং ড. ইউনূসের নাম উল্লেখ করে দেশবাসীকে সতর্ক করেছিলেন। কোটা আন্দোলনের সময় ছাত্রলীগকে ক্যাম্পাস ছাড়ার নির্দেশ দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, শেখ হাসিনা কোনো লাশ বা রক্তপাত চাননি বলেই সংঘাত এড়াতে বলেছিলেন। নানকের দাবি, আওয়ামী লীগের পক্ষে ঢাকা ও আশপাশের জেলাগুলো (মাওয়া, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, বাগেরহাট, গাজীপুর, কেরাণীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী) থেকে লাখ লাখ মানুষের জমায়েত করা সম্ভব ছিল, কিন্তু প্রাণহানি এড়াতে তা করা হয়নি। তিনি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, জাতিসংঘ বাহিনীর অধীনে শতভাগ সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে সবাই একসঙ্গে রাজনীতি ছেড়ে দেবেন। কলকাতায় আওয়ামী লীগের কোনো কার্যালয় থাকার খবরকে ভিত্তিহীন দাবি করে নানক বলেন, অক্সিজেন নেওয়ার জন্য বা সময় কাটানোর জন্য তাঁরা কোথাও বসতেই পারেন, তবে কোনো অফিস নেই। তিনি কলকাতা থেকেই তাঁর নির্বাচনী এলাকা ঢাকা-১৩ (মোহাম্মদপুর) এর নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তাঁর মেয়ে, যিনি বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগের মা ও শিশুবিষয়ক সম্পাদক, বর্তমানে এলাকায় কর্মীদের খোঁজখবর রাখছেন। মোহাম্মদপুরে জুলাই আন্দোলনের সময় ৯টি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। এ বিষয়ে নানক বলেন, তিনি একজন আইনজীবী হিসেবে আইনগত ও কৌশলগতভাবে লড়াই করছেন। এসব মামলাকে ভিত্তিহীন দাবি করে তিনি বলেন, কোনো সাক্ষী তাঁকে সরাসরি ঘটনাস্থলে দেখেননি। শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফিরলে তিনি তাঁর আগেই বাংলাদেশে ফিরবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। বেঁচে থাকলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবারও তাঁকে দেখা যাবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। SHARES অন্যান্য বিষয়: আওয়ামী লীগকলকাতাজাহাঙ্গীর কবির নানকভারতশেখ হাসিনা৫ আগস্ট