সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ নিয়ে বিরোধ: ফিরে দেখা তিন দশকের ইতিহাস প্রকাশিত: ১২:০৩ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২৬ সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে আনুপাতিক হারে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্বের দাবি এ দেশে নতুন নয়। ক্ষমতার পালাবদলে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ—উভয় দলই বিরোধী দলে থাকাকালে এই দাবি তুলেছে। তবে ক্ষমতায় গিয়ে কোনো দলই তা বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। সম্প্রতি সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনেও সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ বণ্টন নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে বড় ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী বিরোধী দল ১০টি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত পরিস্থিতিসহ মোট ১৪টি কমিটির সভাপতি পদ দাবি করেছিল। তবে শেষ পর্যন্ত তারা পেয়েছে কেবল সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতি পদটি। চলতি সংসদে মোট ৫০টি স্থায়ী কমিটি গঠন সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে বিষয়ভিত্তিক কমিটি ১১টি এবং মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটি ৩৯টি। একমাত্র সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতি করা হয়েছে বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরকে। সরকারি দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এবার অতীতের রীতি অনুযায়ী কমিটি গঠন করা হয়েছে। সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধি না দেওয়ার বিষয়টি সামনে এনে সরকারি দল বলছে, সংবিধান সংশোধন হলে জুলাই সনদের প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা হবে। তবে প্রতিটি কমিটিতেই বিরোধী দলের একাধিক সদস্য রাখা হয়েছে। আইন প্রণয়ন ও নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১০ সদস্যের মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটিগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাজ পর্যালোচনা, অনিয়ম ও গুরুতর অভিযোগের তদন্ত এবং বিল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে থাকে। এসব কমিটিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীরা সভাপতি হতে পারেন না, বেসরকারি সংসদ সদস্যরা সভাপতি হন। তবে সভাপতি কোন দল থেকে হবেন বা সদস্য কোন দলের কতজন থাকবেন, তা সংবিধান বা সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতে সুনির্দিষ্ট করা নেই। সংসদে কণ্ঠভোটে কমিটি গঠিত হওয়ায় সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকারি দলের সিদ্ধান্তই এখানে প্রাধান্য পায়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক ও সংসদবিষয়ক গবেষক নিজাম উদ্দিন আহমদ বলেন, বিভিন্ন দেশে সংসদীয় কমিটিতে আনুপাতিক হারে বিরোধী দলকে পদ দেওয়ার রীতি রয়েছে। সরকারি দলের সংসদ সদস্য সভাপতি হলে সাধারণত মন্ত্রণালয়ের স্পর্শকাতর বিষয়গুলো আলোচনায় আসতে চায় না এবং সরকারি দলের সদস্যরাও খুব একটা উদ্যোগী হন না। বিরোধী দল থেকে সভাপতি করা হলে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আলোচনায় আসার সুযোগ বাড়ে। সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ নিয়ে বিরোধের ইতিহাস প্রায় তিন দশকের। ১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদে মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি হতেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা। ১৯৯৬ সালের সপ্তম সংসদে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ কার্যপ্রণালি বিধি সংশোধন করে মন্ত্রীদের সভাপতি হওয়ার সুযোগ বন্ধ করে। তবে ওই সংসদেই বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে দুই দলের বড় বিরোধ তৈরি হয়। কার্যপ্রণালি বিধি সংশোধনের বিষয়ে প্রতিবেদন দিতে গঠিত ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটিতে বিএনপির ৩ জন সদস্য ছিলেন। বিএনপির দাবি ছিল সংসদীয় কমিটি ১২ সদস্যের করা এবং আসনসংখ্যার অনুপাতে কমিটিতে সদস্য রাখার বিধান করা। ১৯৯৭ সালের ১৪ মে বিশেষ কমিটি যে প্রতিবেদন জমা দেয়, তাতে এই দাবিগুলো ছিল না। একই বছরের ১০ জুন সংসদে প্রতিবেদনটি পাস হলে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি ওয়াকআউট করে এবং দীর্ঘদিন সংসদ বর্জন করে। পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালের নভেম্বরে আওয়ামী লীগ স্থায়ী কমিটি গঠন শুরু করে, যার সংখ্যা ছিল ৩৫টি। শুরুতে বিএনপি কমিটির সদস্য হিসেবে কারও নাম দেয়নি। ১৯৯৮ সালের মার্চে দুই দলের সমঝোতার পর ১২ মে ৩৫টি কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা হয়। সেখানে বিএনপিকে ১১১টি সদস্যপদ দেওয়া হলেও কোনো কমিটির সভাপতি পদ দেওয়া হয়নি। ২০০১ সালের অষ্টম সংসদে ক্ষমতার বদল হলে বিএনপি ক্ষমতায় আসে এবং আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে যায়। এবার আওয়ামী লীগ আসনসংখ্যার অনুপাতে ১০টি কমিটির সভাপতি পদ দাবি করে। তবে ক্ষমতাসীন বিএনপি যুক্তি দেখায় যে, আগের সংসদে তাদের ১১৬ জন সদস্য থাকলেও আওয়ামী লীগ তাদের কোনো সভাপতি পদ দেয়নি। আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন কমিটি বর্জন করার পর ২০০৪ সালে প্রতিনিধি দিলেও কোনো কমিটির সভাপতি পদ পায়নি। অবশ্য পরবর্তী সংসদগুলোতে বিরোধী দলকে সভাপতি পদ দেওয়ার কিছু নজির রয়েছে। টিআইবির ২০১৮ সালের ১৭ মে প্রকাশিত 'পার্লামেন্ট ওয়াচ' গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, নবম সংসদে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি থেকে দুটি এবং অন্য বিরোধী দল থেকে একটি কমিটির সভাপতি করা হয়েছিল। দশম সংসদে বিরোধী দল থেকে একটি কমিটির সভাপতি করা হয়। একাদশ সংসদে সরকারি হিসাব কমিটির পাশাপাশি আরও তিনটি কমিটির সভাপতি পদ দেওয়া হয়েছিল বিরোধী দলকে। সেগুলো হলো প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান, শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদ মনে করেন, বিরোধী দল থেকে আনুপাতিক হারে সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা উচিত। তিনি বলেন, এবার আনুপাতিক হারে বিরোধী দলকে সভাপতি পদ দেওয়া হলে নিজেদের ভবিষ্যতের পথও খুলে যেত এবং সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যকার বিদ্যমান দূরত্ব অনেকটাই কমে আসত। SHARES রাজনীতি বিষয়: জাতীয় সংসদবিরোধী দলরাজনৈতিক ইতিহাসসংসদীয় সংস্কারসংসদীয় স্থায়ী কমিটি