ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবে মামলার জট: তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা প্রকাশিত: ৭:৫৪ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৬, ২০২৬ প্রযুক্তির দ্রুত প্রসার এবং দৈনন্দিন জীবনে ডিভাইসের সহজলভ্যতা অপরাধের ধরনে বড় পরিবর্তন এনেছে। বর্তমানে সাইবার অপরাধ ছাড়াও মাদক, চুরি ও হত্যার মতো ফৌজদারি মামলায় ডিজিটাল ফরেনসিকের গুরুত্ব অনেক বেড়েছে। অনেক ক্লুলেস মামলার রহস্য উদ্ঘাটনে ইলেকট্রনিক ডিভাইসের তথ্য বিশ্লেষণ এখন অপরিহার্য। তবে অপরাধ তদন্তে থানা পুলিশ ও তদন্ত সংস্থাগুলোর জব্দ করা ইলেকট্রনিক ডিভাইসের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়লেও সেই অনুপাতে পুলিশের ডিজিটাল ফরেনসিক সক্ষমতা বাড়েনি। ফলে আলামতের জট দীর্ঘ হচ্ছে এবং সময়মতো ফরেনসিক রিপোর্ট না পাওয়ায় বিচারপ্রক্রিয়া ও তদন্ত বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তদন্ত সংস্থা সিআইডির সদর দপ্তর ও খুলনা বিভাগীয় ল্যাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ছাড়াও বেসরকারি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল ফরেনসিক সুবিধা পেয়ে থাকে। ২০১২ সালে ঢাকায় এবং ২০২২ সালে খুলনায় ডিজিটাল ল্যাব চালু হলেও আলামতের চাপ এখন বহুগুণ বেশি। ল্যাবগুলোর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ১৫ বছরে ঢাকা ও খুলনা ল্যাবে ২৬ হাজার ৯৪২টি মামলার বিপরীতে মোট ৭৯ হাজার ১৪৪টি আলামত গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৯ হাজার ৯৪৩টি মামলার বিপরীতে ৫৫ হাজার ৯৫৭টি আলামত নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে দুই ল্যাবে ২৫ হাজার ৫৬৪টি ডিজিটাল আলামত ঝুলে আছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১২ সালের তুলনায় বর্তমানে ডিভাইস বিশ্লেষণের চাহিদা ৩৭২ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১২ সালে যেখানে মাত্র ৭টি মামলার ১৮টি আলামত বিশ্লেষণ করা হয়েছিল, সেখানে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ২৬০৩টি মামলায় ১১ হাজার ১১১টি আলামত জমা পড়েছে। আলামতের ধরনভেদে রিপোর্ট পেতে আবেদনকারীদের গড়ে ৬ মাস থেকে ২ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। ২০১৭ সালে নিষ্পত্তির হার ৯০ শতাংশ থাকলেও ২০২৬ সালে তা ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে। এছাড়া ২০১২ সালে ৭ মামলায় নিষ্পত্তির হার ১০০ শতাংশ, ২০১৩ সালে ২৪ মামলায় ১০০%, ২০১৪ সালে ৫৮ মামলায় ২২.৪১%, ২০১৫ সালে ২৫৭ মামলায় ৭১.৬০%, ২০১৬ সালে ৫৩৩ মামলায় ৫৫.৫৩%, ২০১৭ সালে ১১০৮ মামলায় ৯০.০৭%, ২০১৮ সালে ১১০৬ মামলায় ৮৩.৪৫%, ২০১৯ সালে ১৬০২ মামলায় ৫৬.৯৯%, ২০২০ সালে ২৫৯০ মামলায় ৬৪.১৭%, ২০২১ সালে ৩৫৭৯ মামলায় ৮২.৯৫%, ২০২২ সালে ৩৫৬৫ মামলায় ৭৮.৭৯%, ২০২৩ সালে ৩৫৬১ মামলায় ৯০.১৭%, ২০২৪ সালে ২৭৫৯ মামলায় ৮৬.২৬% এবং ২০২৫ সালে ৩২৯০ মামলায় নিষ্পত্তির হার ছিল ৭৪.৬৬%। তদন্তে বিলম্বের একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়, ২০২৫ সালের অক্টোবরে সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় ভুয়া পরীক্ষার্থী ধরার ঘটনায় ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ তদন্তের দায়িত্ব পায়। মামলার আলামত সিআইডিতে পাঠানোর পর ফরেনসিক রিপোর্ট পেতে প্রায় ৮ মাস সময় লেগেছে। যদিও অভিযুক্তদের স্বীকারোক্তি ও অন্যান্য প্রমাণ ছিল, তবুও ফরেনসিক রিপোর্টের অপেক্ষায় মামলার চার্জশিট দিতে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়। তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পুরনো ডিভাইস দিয়ে এআই বা অ্যানক্রিপ্টেড অ্যাপের সর্বশেষ সংস্করণের তথ্য বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। ফরেনসিক ল্যাবের কর্মকর্তারা প্রধান চারটি চ্যালেঞ্জের কথা জানিয়েছেন: প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন ও নতুন ধরনের সাইবার অপরাধ, অ্যানক্রিপ্টেড ও আধুনিক সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপ্লিকেশনের ডেটা উদ্ঘাটনের জটিলতা, ল্যাবের সক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত আলামতের চাপ এবং আন্তর্জাতিক মানের যন্ত্রপাতি, সফটওয়্যার ও প্রশিক্ষিত জনবলের অভাব। সিআইডির মিডিয়া শাখার সদ্য সাবেক বিশেষ পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন খান জানিয়েছিলেন, এই স্থবিরতা কাটাতে প্রতিটি বিভাগে ফরেনসিক ল্যাব স্থাপন, আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজন এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে কোরিয়ান সংস্থা কোইকার সহায়তায় চট্টগ্রামে বিভাগীয় ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে, যা শীঘ্রই কার্যক্রম শুরু করবে। এর মাধ্যমে চট্টগ্রাম বিভাগের মামলাগুলোর পরীক্ষা দ্রুত সম্পন্ন হবে এবং ঝুলন্ত মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে। SHARES অন্যান্য বিষয়: অপরাধ তদন্তডিজিটাল ফরেনসিকমামলার জটসাইবার অপরাধসিআইডি