সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াতের ফজিলত ও আমলের গুরুত্ব

প্রকাশিত: ১০:১০ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৩, ২০২৬

পবিত্র কোরআনের সবচেয়ে বড় সূরা আল-বাকারা। মোট ২৮৬টি আয়াত সম্বলিত এই সূরাটিতে প্রায় ৬ হাজার ২২১টি শব্দ ও ২৫ হাজার ৫০০টি অক্ষর রয়েছে। মদিনায় নাজিল হওয়া এই সুরায় তাওহিদ, ঈমানের শিক্ষা, মুনাফিকদের পরিচয় এবং ইসলামের মৌলিক বিধিবিধানের বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। এর সর্বশেষ দুটি আয়াতে ঈমানের ঘোষণা, আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা ও সাহায্যের আবেদন ফুটে উঠেছে, যা একজন মুমিনের জীবনে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পবিত্র কোরআনের সূরাগুলোর নাম, আয়তন ও অবতরণের পটভূমিতেও রয়েছে বৈচিত্র্য। ২৮৬ আয়াত নিয়ে সূরা আল-বাকারা কোরআনের দীর্ঘতম সূরা।

আয়াত দুটি সম্পর্কে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, তিনি যখন সিদরাতুল মুনতাহায় গমন করেন, তখন তাঁকে তিনটি বিশেষ উপহার দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে অন্যতম হলো সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত। এছাড়া মিরাজের রাতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের নির্দেশনার পাশাপাশি এই আয়াত দুটি প্রাপ্তির সুসংবাদও হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে এই বর্ণনাটি পাওয়া যায়।

হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে এসেছে, একবার জিবরাইল (আ.) নবী করিম (সা.)-এর কাছে থাকা অবস্থায় আকাশ থেকে এক বিশেষ আওয়াজ শুনতে পান। তিনি জানালেন, আজই আসমানের এমন একটি দরজা খোলা হয়েছে যা আগে কখনো খোলা হয়নি এবং ওই দরজা দিয়ে একজন ফেরেশতা অবতরণ করেছেন। ওই ফেরেশতা নবীজিকে সূরা ফাতিহা ও সূরা বাকারার শেষাংশের সুসংবাদ দিয়েছেন, যা পূর্ববর্তী কোনো নবীকে দেওয়া হয়নি। কোনো সূরা দীর্ঘ, কোনোটি মাঝারি, আবার কোনোটি ছোট।

আয়াত দুটির তিলাওয়াত সম্পর্কে মহানবী (সা.) উৎসাহ দিয়ে বলেছেন, কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তিরই এই দুই আয়াত পাঠ না করে ঘুমানোর উচিত নয়। তিনি আরও জানিয়েছেন যে, আল্লাহ তাআলা এই দুটি আয়াত তাঁর আরশের নিচের ভান্ডার থেকে বিশেষ উপহার হিসেবে দিয়েছেন। তাই নিজেরা এই আয়াত শেখার পাশাপাশি পরিবারের অন্যদের এবং স্ত্রীদেরও শিক্ষা দেওয়ার কথা বলেছেন তিনি।

হজরত আবু মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, নবীজি (সা.) বলেছেন, রাতে ঘুমানোর আগে যে ব্যক্তি এই দুটি আয়াত তিলাওয়াত করবে, তার জন্য তা যথেষ্ট হবে। এই হাদিসের ব্যাখ্যায় আলেমরা বলেন, নিয়মিত এই আমল করলে মানুষ রাতের অনিষ্ট ও যেকোনো অশুভ বিষয় থেকে নিরাপদ থাকে। সাহাবি হজরত আলী (রা.)-ও এই আয়াত দুটির নিয়মিত আমলের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষাপটে এসব বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। মানুষ যে ভালো বা মন্দ কাজ করে, তার প্রতিফল তারই প্রাপ্য। বর্ণনায় রাতের অনিষ্ট থেকে সুরক্ষা এবং অপ্রিয় বিষয় থেকে হেফাজতের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

সূরা বাকারার ২৮৫ নম্বর আয়াতে রাসুল ও মুমিনদের বিশ্বাসের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, তারা আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতা, কিতাব ও রাসুলদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে এবং আল্লাহর রাসুলদের মধ্যে কোনো পার্থক্য করে না। তারা বলে, ‘আমরা শুনলাম ও আনুগত্য করলাম। হে আমাদের প্রতিপালক, আমরা আপনার কাছে ক্ষমা চাই এবং আপনার দিকেই আমাদের প্রত্যাবর্তন।’

পরবর্তী আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ কোনো ব্যক্তিকে তার সামর্থ্যের বাইরে বোঝা চাপিয়ে দেন না। মানুষ নিজের কর্মের প্রতিদান পায়। এরপর বান্দা আল্লাহর কাছে দোয়া করে যেন ভুলে বা ভুলবশত কোনো পাপ হলে তা ক্ষমা করা হয়। পূর্ববর্তীদের ওপর যেমন কঠিন দায়িত্ব ছিল, তা যেন না দেওয়া হয় এবং সাধ্যের অতীত ভার যেন চাপানো না হয়। পাপ মোচন ও রহমত কামনার মাধ্যমে আয়াতে আল্লাহকে অভিভাবক হিসেবে মেনে নিয়ে সাহায্য চাওয়া হয়েছে। আয়াতের শেষে আল্লাহকে অভিভাবক হিসেবে স্বীকার করে অবিশ্বাসী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সাহায্য প্রার্থনা করা হয়েছে।

ইসলামি গবেষকদের মতে, এই আয়াতগুলো কেবল তিলাওয়াতের বিষয় নয়, বরং এগুলো আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও সমর্পণের শিক্ষা বহন করে। নিয়মিত তিলাওয়াতের মাধ্যমে একজন মুসলিম আল্লাহর নৈকট্য ও দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ লাভ করতে পারেন। মহান আল্লাহ যেন উম্মতে মুহাম্মদিকে এই ফজিলতপূর্ণ আমলগুলো নিয়মিত করার তাওফিক দান করেন।