জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে উত্তপ্ত বাংলাদেশের রাজনীতি

প্রকাশিত: 11:03 AM, July 22, 2026

২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্ণ হলো। দেড় হাজারেরও বেশি তরুণের আত্মত্যাগ এবং ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে বাংলাদেশ আজ এক বড় অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি। একদিকে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও ন্যায়বিচারের বিপুল প্রত্যাশা, অন্যদিকে সেই প্রতিশ্রুতি পূরণে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তৈরি হয়েছে তীব্র বাদানুবাদ ও উত্তাপ।

বিগত দুই বছরের রাজনৈতিক সমীকরণে দেশে কিছু ঐতিহাসিক ও দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘ স্বৈরাচারী শাসনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী প্রধান বিরোধী দল এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) অন্যতম শরিক হিসেবে সংসদে কার্যকর বিরোধী কণ্ঠস্বর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান যেমনটি মনে করিয়ে দিয়েছেন, দেশের ১৮ কোটি মেহনতি মানুষের পরিশ্রমে ব্যাংক খাতের সংকট ও অর্থ পাচারের ধকল কাটিয়ে অর্থনীতি এখনও সচল রয়েছে।

তবে এই অর্জনের মধ্যেও শহীদ পরিবারগুলোর মধ্যে অপূর্ণতার বেদনা ও ক্ষোভ বাড়ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলনে (আইসিজেআর-২) 'জবাবদিহি, সংস্কার ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ' প্রতিপাদ্যে এই সংস্কারের দাবিগুলো আবারও সামনে এসেছে। শহীদ জাবির ইব্রাহিমের মা ও সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য রোকেয়া বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, গণহত্যার বিচারপ্রক্রিয়া চরম ধীরগতির শিকার এবং 'জুলাই সনদ' বাস্তবায়নে টালবাহানা করা হচ্ছে। মূলত ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের উদ্যোগে ২৫টি রাজনৈতিক দলের স্বাক্ষরিত এই 'জুলাই সনদ' ও সংস্কারের পক্ষে গণভোটে রায় দিলেও তা বাস্তবায়নে কালক্ষেপণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এনসিপির আহ্বায়ক ও সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম অভিযোগ তুলেছেন যে, ক্ষমতাসীন দল গণভোটের রায়কে কার্যত উপেক্ষা করছে এবং সনদের মূল ধারাগুলো বাস্তবায়ন করেনি। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে প্রশ্ন তোলেন, ক্ষমতার বদল হলেও যদি পুরোনো লুটপাট ও চাঁদাবাজি বহাল থাকে, তবে তরুণদের আত্মত্যাগের মূল্য কোথায়? একই সুর মিলিয়ে জামায়াতে ইসলামীও বলছে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কার্যকর পথ খোঁজার দায়িত্ব সরকারের। বিরোধী দলগুলো বর্তমানে মাসব্যাপী গণপদযাত্রা ও 'জুলাই জাগরণ' কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে।

অন্যদিকে ক্ষমতাসীন বিএনপির মহাসচিব ও বর্তমান মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, তাদের সরকার জুলাই সনদের প্রতিটি অক্ষর বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং নির্বাচিত প্রক্রিয়ায় তা সম্পন্ন করা হবে। তিনি পাল্টা দাবি করেন, এই গণঅভ্যুত্থান কোনো একক দলের সম্পত্তি নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলন ছিল। কিছু মহল এই আন্দোলনকে ক্ষমতার হাতিয়ার বানিয়ে সনদের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গণহত্যার বিচারপ্রক্রিয়ার শ্লথগতি, সংস্কারে দ্বিধাদ্বন্দ্ব এবং তৃণমূল পর্যায়ে পুরোনো অপসংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি বর্তমান সরকারের বড় বিচ্যুতি। তবে একই সঙ্গে বিরোধী দলগুলোর অতিরিক্ত চাপ ও প্রতিটি মতপার্থক্যকে 'ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান' বলে ট্যাগ দেওয়ার প্রবণতাও দেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এই রাজনৈতিক উত্তাপ থেকে মুক্তি পেতে হলে সরকারকে সংস্কারের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে, শহীদ পরিবারের পুনর্বাসন ও আহতদের চিকিৎসাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং সমস্ত বিতর্ক রাজপথের পরিবর্তে সংসদে আলোচনা করতে হবে। জুলাইয়ের তরুণদের কাঙ্ক্ষিত বৈষম্যহীন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হলে সব পক্ষের মধ্যে জাতীয় ঐকমত্য বজায় রাখা জরুরি।