‘চলে আসুন ষোলোশহর’: শহীদ ওয়াসিমের সাহসী ডাক ও মুরাদপুরের রক্তঝরা স্মৃতি প্রকাশিত: 1:38 PM, July 22, 2026 গত ১৬ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামের মুরাদপুর ও ষোলোশহর এলাকায় ছাত্রদল নেতাকর্মী ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগ-যুবলীগের সশস্ত্র হামলা এবং চবি ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম আকরামের শাহাদাতের সেই রক্তঝরা স্মৃতি তুলে ধরেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নোমান। আগের দিন রাতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের রাজপথে থাকার নির্দেশনার পর, ১৬ জুলাই বেলা পৌনে ২টায় নেতাকর্মীদের ষোলোশহর রেলস্টেশনে জড়ো হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। তবে সেখানে যাওয়ার পথেই মির্জাপুলের কাছাকাছি পৌঁছালে ওয়াসিম আকরাম ফোন করে সতর্ক করেন যে, নগর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিম রনি ও তাঁর সশস্ত্র লোকজন ষোলোশহরে অবস্থান নিয়েছে। ওয়াসিম জানান, তিনি কলেজ ছাত্রদলের বড় ভাইদের সঙ্গে শিক্ষা বোর্ডের দিকে আছেন এবং সেখানে মহানগর ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সালাউদ্দিন শাহেদও উপস্থিত রয়েছেন। পরিস্থিতি বিবেচনা করে নোমান ছাত্রদলের কর্মীদের নিয়ে বেলা ২টা ১৫ মিনিটের দিকে মুরাদপুর ব্রিজের ওপর বিচ্ছিন্নভাবে অবস্থান নেন। সে সময় একদিকে ষোলোশহরের ২ নম্বর গেট এবং অন্যদিকে মুরাদপুর ডাচ-বাংলা ব্যাংকের কাছে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ সশস্ত্র অবস্থান নিয়েছিল। পায়ে অপারেশন থাকা সত্ত্বেও নোমান যেকোনো পরিস্থিতিতে মিছিল করার সিদ্ধান্ত নেন। এর কিছুক্ষণ পর চবি ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মিজান জানান যে ওয়াসিম তাঁদের সঙ্গে যোগ দিতে আসছেন। ওয়াসিম এসে পৌঁছালেও তাঁর সঙ্গে আরও দুজন ছোট ভাইকে নিয়ে আসার জন্য কিছুটা সময় চেয়ে নেন। চারদিকে সশস্ত্র ছাত্রলীগ-যুবলীগের অবস্থানের কারণে সাধারণ মানুষ তখন রাস্তায় নামতে ভয় পাচ্ছিল। তবে চবি ছাত্রদলের বর্তমান যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মিলন ও আসিফের সমর্থনে এবং নেতাকর্মীদের মনোবল ধরে রাখতে মুরাদপুর ব্রিজের ওপর থেকেই স্লোগান শুরু করা হয়। ‘মেধা না কোটা’ স্লোগান শুরু হতেই আশেপাশের সাধারণ শিক্ষার্থীরা দলে দলে মিছিলে যোগ দিতে থাকেন। এ সময় ছাত্রলীগ দুই দিক থেকে ঘেরাও করে হামলা চালালে আন্দোলনকারীরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। একটি গ্রুপ চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের দিকে এবং অন্য গ্রুপটি মুরাদপুর গ্রিলের রেলিং ভেঙে ডাচ-বাংলা ব্যাংকের নিচ থেকে আক্রমণকারীদের প্রতিহত করতে এগিয়ে যায়। নোমান সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে শিক্ষা বোর্ডের দিক থেকে আসা হামলাকারীদের ধাওয়া দিয়ে ২ নম্বর রেলগেটের দিকে ছত্রভঙ্গ করে দেন। পরে মির্জাপুলের দিক থেকে ছাত্রলীগের আরেকটি গ্রুপ হামলা চালালে সেখানেও প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয় এবং সাধারণ ছাত্রদের সহায়তায় হামলাকারীরা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। এরই মধ্যে খবর আসে, ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রনির নেতৃত্বে সশস্ত্র ক্যাডাররা ২ নম্বর গেট থেকে গুলি করতে করতে শিক্ষা বোর্ডের দিকে এগোচ্ছে। সম্ভাব্য ঘেরাও এড়াতে নোমান মুরাদপুর মসজিদের সামনে মেইন রোডে অবস্থান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বেলা আনুমানিক ২টা ৫০ মিনিটে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম হোয়াটস্যাপে ফোন করে চট্টগ্রামের পরিস্থিতি জানতে চান এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশ অনুযায়ী রাজপথে সর্বোচ্চ প্রতিরোধ গড়ে তোলার চূড়ান্ত বার্তা পৌঁছে দেন। নোমান তাৎক্ষণিকভাবে এই সাংগঠনিক নির্দেশনা উপস্থিত সবার মাঝে ছড়িয়ে দেন। এর কিছুক্ষণ পর মির্জাপুল ও মসজিদ গলির দিক থেকে ছাত্রলীগ আবারও হামলা চালালে প্রায় ১৫-২০ মিনিট ধরে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলে। শিক্ষার্থীদের অনড় অবস্থানের মুখে হামলাকারীরা পালিয়ে গেলে মুরাদপুর মোড় আন্দোলনকারীদের নিয়ন্ত্রণে আসে। নোমান সহযোদ্ধাদের একাংশকে সেখানে রেখে বাকিদের নিয়ে শিক্ষা বোর্ডের সামনের প্রতিরোধে যোগ দিতে যান। সেখানে আগে থেকে ওত পেতে থাকা সন্ত্রাসীদের গুলিতে ওয়াসিম আকরাম গুরুতর আহত হন। মুমূর্ষু অবস্থায় তাঁকে রিকশায় করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। নোমান ইউএসটিসি মেডিকেল কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি ডা. গিয়াস উদ্দিন নয়নকে দ্রুত মেডিকেলে যাওয়ার অনুরোধ জানান। কিছুক্ষণ পর হাজেরা তজু ডিগ্রি কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ও ওয়াসিমের বন্ধু পারভেজ মোশাররফ ফোন করে জানান যে, ওয়াসিম গুলিবিদ্ধ হয়ে মেডিকেল ইমার্জেন্সিতে মৃত অবস্থায় পড়ে আছেন। খবরটি বিশ্বাস করতে না পেরে নোমান কান্নাজড়িত কণ্ঠে চট্টগ্রাম জেলা ড্যাবের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. মেহেদী হাসানকে জরুরি বিভাগে গিয়ে খোঁজ নিতে বলেন। পরে ওয়াসিমের নম্বরে পুনরায় ফোন করা হলে অপর প্রান্ত থেকে তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের বর্তমান সহসভাপতি জিহাদ এবং চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল রহমান রিমানসহ নোমান হাসপাতালের লাশঘরে যান এবং ডা. মেহেদী হাসানের ইশারায় মাঝখানে পড়ে থাকা ওয়াসিমের নিথর দেহটি শনাক্ত করেন। নিজের কোনো আপন ভাই না থাকায় ওয়াসিমকে ছোট ভাইয়ের মতো মনে করতেন নোমান। ওয়াসিমের সেই সাহসী ডাক ‘চলে আসুন ষোলোশহর’ এবং তাঁর আত্মত্যাগ এই জাতি চিরকাল শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ রাখবে। SHARES অন্যান্য বিষয়: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলছাত্রদলবৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনমুরাদপুর সংঘর্ষশহীদ ওয়াসিম আকরাম১৬ জুলাই