এলডিসি উত্তরণের পর দেশি শিল্প রক্ষায় বাণিজ্য সুরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ প্রকাশিত: 11:32 AM, July 25, 2026 স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়ে উঠবে। এই পরিস্থিতিতে বিদেশি পণ্যের অন্যায্য আমদানি থেকে দেশি শিল্প খাতকে রক্ষা করতে অ্যান্টি-ডাম্পিং, কাউন্টারভেইলিং ও সেফগার্ড ব্যবস্থার মতো বাণিজ্য প্রতিরক্ষামূলক সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে সরকার, শিল্প খাত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে একটি সমন্বিত অংশীদারত্ব গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) প্রস্তুত করা ‘বাণিজ্য প্রতিরক্ষা পদ্ধতি’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এই সুপারিশগুলো তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনটি তৈরিতে প্রধান ভূমিকা রেখেছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও সেলের সাবেক মহাপরিচালক হাফিজুর রহমান। সম্প্রতি তিনি বিটিটিসির কর্মকর্তাদের কাছে এই সুপারিশমালা উপস্থাপন করেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এলডিসি উত্তরণের পর শুল্ক-সুবিধা কমে যাওয়ার কারণে বিদেশি পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা তীব্র হবে, যা দেশীয় শিল্পের জন্য ঝুঁকি তৈরি করবে। বাণিজ্য প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা বলতে শুধু অ্যান্টি-ডাম্পিং, কাউন্টারভেইলিং ও সেফগার্ডের মতো তিনটি পদ্ধতিকে বোঝায় না। এটি মূলত একটি পূর্ণাঙ্গ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, যার মধ্যে আইন, তথ্য সংগ্রহ, তদন্ত, বাজার পর্যবেক্ষণ, আন্তর্জাতিক মামলা পরিচালনা এবং দক্ষ জনবল তৈরির মতো বিষয়গুলো জড়িত। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নিয়ম অনুযায়ী, উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে পণ্য রপ্তানি করাকে ‘ডাম্পিং’ বলা হয় এবং তা ঠেকাতে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করা হয়। অন্যদিকে, বিদেশি সরকার রপ্তানিতে বিশেষ ভর্তুকি দিলে তার বিরুদ্ধে কাউন্টারভেইলিং এবং হঠাৎ আমদানি বেড়ে গিয়ে দেশি শিল্পের ক্ষতি হলে সাময়িক সুরক্ষায় সেফগার্ড ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে। এই সংকট মোকাবিলায় প্রতিবেদনে বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সরকার, শিল্প খাত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে আনুষ্ঠানিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর, একটি ‘জাতীয় বাণিজ্য প্রতিরক্ষা কাউন্সিল’ গঠন, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য বাণিজ্য সুরক্ষা সহায়তা কেন্দ্র ও যৌথ বাণিজ্য সুরক্ষা সেল স্থাপন, তথ্য বিনিময়ের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমন্বয়ে একটি একাডেমিক কনসোর্টিয়াম গঠন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, তৈরি পোশাক ছাড়াও চামড়া, ওষুধ, পাটপণ্য, প্লাস্টিক, সিরামিক ও কৃষিপণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে জায়গা করে নিচ্ছে। তবে এলডিসি উত্তরণের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বড় বাজারগুলোতে শুল্ক-সুবিধা কমে যাবে। এ বিষয়ে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, জাতীয় বাণিজ্য প্রতিরক্ষা কাউন্সিল গঠনসহ যেসব সুপারিশ এসেছে, তা দ্রুত বাস্তবায়নের দিকে যাওয়া উচিত। এলডিসি উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা টিকিয়ে রাখাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিবেদনে তদন্তের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যের ঘাটতিকে একটি বড় দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিদেশি পণ্যের দাম, দেশীয় উৎপাদন হ্রাস, শ্রমিক ছাঁটাই কিংবা মুনাফা কমে যাওয়ার মতো তথ্যগুলো মূলত থাকে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ী সংগঠনের কাছে। কিন্তু বাংলাদেশের অনেক শিল্প সমিতি আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী তথ্য সংরক্ষণ করে না। ফলে ক্ষতির শিকার হলেও তা প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং আইনি প্রতিকার নেওয়ার সুযোগ হাতছাড়া হয়। এ প্রসঙ্গে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ডব্লিউটিও না মানলেও বাংলাদেশকে তা মেনে চলতে হবে। এলডিসি উত্তরণের প্রেক্ষাপটে জাতীয় বাণিজ্য প্রতিরক্ষা কাউন্সিল গঠনের মতো সুপারিশগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে। বাণিজ্য প্রতিরক্ষায় অর্থনীতি, পরিসংখ্যান, হিসাববিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক আইনের সমন্বিত প্রয়োগ প্রয়োজন হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছে বিটিটিসি। প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলা হয়, ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিয়মিত শিল্পের সঙ্গে তথ্য বিনিময় করে, যুক্তরাষ্ট্রে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আবেদনের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু হয় এবং ভারতে বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণার অর্থনৈতিক বিশ্লেষণকে তদন্তে কাজে লাগানো হয়। অথচ বাংলাদেশে তথ্য ভাগাভাগি ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির জানান, এলডিসি উত্তরণের প্রভাব নিয়ে সরকার সচেতন রয়েছে এবং বিভিন্ন খাত নিয়ে কাজ করছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটকে নতুনভাবে সাজানো হচ্ছে, ডব্লিউটিওর নিয়মনীতি নিয়ে কাজের জন্য প্যানেল তৈরি এবং ইইউসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে জাতীয় বাণিজ্য প্রতিরক্ষা কাউন্সিল গঠনের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, অনেকেই অনেক সুপারিশ করছেন, যার সব বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। তবে যেসব প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে, তাতে আগামী এক বছরের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। SHARES অর্থনীতি বিষয়: অ্যান্টি-ডাম্পিংএলডিসি উত্তরণট্যারিফ কমিশনদেশীয় শিল্পবাণিজ্য মন্ত্রণালয়বাণিজ্যনীতি