প্রশাসনে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ ও আওয়ামী ঘনিষ্ঠদের সরাচ্ছে সরকার

প্রকাশিত: 9:41 AM, July 26, 2026

রাষ্ট্র পরিচালনায় কোনো ঝুঁকি না নেওয়ার নীতি গ্রহণ করেছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। ক্ষমতার প্রথম পাঁচ মাস পার হওয়ার পর এখন প্রশাসন ও স্পর্শকাতর গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো থেকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ বা অবিশ্বাস্য ব্যক্তিদের সরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। বিশেষ করে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী এবং যাদের সঙ্গে এখনো গোপন যোগাযোগের সন্দেহ রয়েছে, তাদের ওপর কড়া নজরদারি রাখা হচ্ছে। ক্ষমতার বিকল্প কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত কোনো প্রতিষ্ঠানে সরকারের আস্থাভাজন নয় এমন কাউকে রাখা হবে না বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।

এই শুদ্ধি অভিযানের অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে বড় ধরনের প্রশাসনিক পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ৬৭ জন police কর্মকর্তাকে এবং প্রশাসনের ৯ জন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। এর আগে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ও আওয়ামী ঘনিষ্ঠতা ও নানা নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে অর্ধশতাধিক কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। একইভাবে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ১৩ জন সচিব, ২২ জন জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং ১০১ জন চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছিল।

সরকারের পর্যালোচনায় ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় সম্প্রতি রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে সরে দাঁড়ানোর বার্তা দেওয়া হয়েছিল এবং গত শুক্রবার তিনি পদত্যাগ করেন। নতুন রাষ্ট্রপতির মনোনয়নের ক্ষেত্রে অতীত অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে অত্যন্ত ধীরস্থির ও সতর্ক কৌশল অবলম্বন করছে সরকার। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি করা হলেও রাজনৈতিক মতভেদের কারণে তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল, যা দলটির জন্য অস্বস্তিকর ছিল। এরপর অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে রাষ্ট্রপতি করার ফলাফলও বিএনপির অনুকূলে যায়নি। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার কোনো প্রকার ঝুঁকি নেওয়া হবে না এবং একজন বিচক্ষণ, অভিজ্ঞ ও দলের দর্শনে শতভাগ বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে এই পদে নিয়ে আসা হবে।

শুধু অভ্যন্তরীণ বিষয়ই নয়, দেশের বাইরের ভূরাজনৈতিক তৎপরতাও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। গত ২২ জুলাই ভারতের একজন প্রভাবশালী সাংবাদিকের ফেসবুক পোস্টে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বদলের আগাম ইঙ্গিত এবং সম্প্রতি শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার বার্তাকে সরকার নিছক রাজনৈতিক স্টান্টবাজি হিসেবে দেখছে না। ৫ আগস্টের বিপ্লব এবং ১৫ আগস্টের শোক দিবসকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার কোনো চেষ্টা হচ্ছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এছাড়া রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের কয়েক ঘণ্টা পর মেট্রো স্টেশনের নিচে বোমা উদ্ধারের ঘটনার পেছনে কোনো সুদূরপ্রসারী চক্রান্ত রয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।

এ বিষয়ে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল জানান, তারা কোনো ধরনের প্রতিশোধের রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন না। তবে যারা রাষ্ট্রের ভেতরে থেকে ক্ষতি করতে চায়, তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো ঠিক হবে না। বিচার-বিশ্লেষণ ও তদন্তের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের সরিয়ে দেওয়া গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার অংশ।

দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর পুরোনো রেজিমের অবশিষ্টাংশ ক্ষমতায় থাকা বাস্তবসম্মত নয়। শুরুতে প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা ও রাজনৈতিক ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সহজ করার সুবিধার্থে রাষ্ট্রপতিকে রাখা হলেও এখন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিজেদের আস্থাভাজন লোক বসিয়ে শাসন ক্ষমতায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে সরকার। এতে ভবিষ্যতে সরকার কোনো বড় ধরনের রাজনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়বে না।