আনোয়ারায় চীনা শিল্পাঞ্চলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন আজ

প্রকাশিত: 11:46 AM, July 27, 2026

আনোয়ারায় প্রায় ৮০০ একর জমির ওপর গড়ে উঠতে যাওয়া নতুন শিল্পাঞ্চলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন বা গ্রাউন্ডব্রেকিং অনুষ্ঠান আজ সোমবার (২৭ জুলাই) অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই বৃহৎ প্রকল্পটিকে ঘিরে সরকার প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলারের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আসার প্রত্যাশা করছে। একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশে উচ্চমূল্য সংযোজনকারী শিল্পে চীনা বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ও বাংলাদেশ সিইআইজেড কম্পানি লিমিটেডের যৌথ আয়োজনে এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি হিসেবে যোগ দেবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এছাড়া বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন, বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী এবং বাংলাদেশ সিইআইজেড কম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান ওয়াং বেনচিয়ানসহ দুই দেশের সরকারি ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এই গ্রাউন্ডব্রেকিং শুধু একটি শিল্পাঞ্চলের নির্মাণ কাজ শুরুর আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার হওয়ার ফলে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রকল্পটি বাংলাদেশ ও চীনের সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) উদ্যোগের অংশ হিসেবে যাত্রা শুরু করে। ২০১৪ সালে সমঝোতা হলেও ডেভেলপার নির্বাচন ও অর্থায়ন নিয়ে দীর্ঘ সময় প্রকল্পটি ঝুলে ছিল। পরবর্তীতে ২০২২ সালে চীনা সরকার চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনকে (সিআরবিসি) ডেভেলপার হিসেবে মনোনীত করে। গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় বেজা ও সিআরবিসির মধ্যে ডেভেলপার চুক্তি বিনিময়ের পর প্রকল্পটি নতুন গতি পায়।

আনোয়ারা অর্থনৈতিক অঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য সরকার চার হাজার ১৮৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকার প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে এক হাজার ৭২২ কোটি টাকা সরকারি অর্থায়ন এবং দুই হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা চীনের প্রেফারেনশিয়াল বায়ার্স ক্রেডিট থেকে আসবে। প্রকল্পের আওতায় ২০ হাজার ডেডওয়েট টন ধারণক্ষমতার বহুমুখী জেটি, সংযোগ সড়ক ও সেতু, চার লেনের সড়ক, ২৫ মিলিয়ন লিটার ধারণক্ষমতার কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার, বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র, গ্যাস ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থাসহ প্রয়োজনীয় সব অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পটি ২০৩১ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে।

বেজার নির্বাহী সদস্য (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মেজর জেনারেল (অব.) মো. নজরুল ইসলাম জানান, প্রথম তিন বছরের মধ্যেই অন্তত ৬০ শতাংশ শিল্প প্লট কারখানা স্থাপনের জন্য প্রস্তুত করা হবে। এখানে বস্ত্র, প্রযুক্তিনির্ভর তৈরি পোশাক, ইলেকট্রনিক্স, সেমিকন্ডাক্টর, টেলিযোগাযোগ সরঞ্জাম, তথ্য-প্রযুক্তি, ফার্মাসিউটিক্যালস, মেডিক্যাল ডিভাইস ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো উচ্চমূল্য সংযোজনকারী শিল্প গড়ে উঠবে বলে সরকার আশা করছে।

চীনা বিনিয়োগের প্রবণতাও এখন বাংলাদেশের পক্ষে ইতিবাচক। বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেপজা) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংস্থাটি ৩৬টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ভূমি ইজারা চুক্তি করেছে, যার সম্ভাব্য বিনিয়োগ ৭১ কোটি ৭৭ লাখ ডলার। এর মধ্যে ২৩টি প্রতিষ্ঠানই চীনা মালিকানাধীন বা চীনা যৌথ উদ্যোগের, যাদের সম্ভাব্য বিনিয়োগ প্রায় ৪৯ কোটি ৮৯ লাখ ডলার। অর্থাৎ নতুন বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই এসেছে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে। পোশাক খাতের বাইরে ড্রোন, সেমিকন্ডাক্টর, ইলেকট্রনিক্স, কপার পণ্য, মেডিক্যাল ডিভাইস, লজিস্টিকস ও হাইড্রোপনিক প্রযুক্তিতেও চীনা বিনিয়োগ বাড়ছে।

বিডা জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরের সময় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রায় ৯২১ কোটি ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগ প্রস্তাব পাওয়া গেছে। এসব প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন ও বৈদেশিক বিনিয়োগে নতুন গতি আসবে বলে আশা করছে সরকার।