তীব্র সংকটে শিল্পে নতুন গ্যাস সংযোগ আপাতত বন্ধ রাখছে সরকার প্রকাশিত: 2:19 PM, July 28, 2026 দেশে গ্যাসের তীব্র সংকট এবং ক্রমাগত উৎপাদন কমে যাওয়ার মুখে শিল্পকারখানায় নতুন গ্যাস সংযোগ আপাতত স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় গত ১৪ জুলাই পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানকে পাঠানো এক চিঠিতে এই সিদ্ধান্তের কথা জানায়। চিঠিতে বলা হয়, দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে এবং ভাসমান এলএনজি টার্মিনালগুলোর (এফএসআরইউ) মাধ্যমে আমদানি সীমাবদ্ধ থাকায় এই মুহূর্তে শিল্প খাতে নতুন গ্যাস সংযোগের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে না। জ্বালানি খাতের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর গড়ে দৈনিক ১৫ কোটি ঘনফুটের বেশি গ্যাস উৎপাদন কমছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্র বলছে, প্রতি সপ্তাহে বা প্রতিদিন কমছে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন। নতুন কূপ খনন করেও উৎপাদন ধরে রাখা যাচ্ছে না। এক দশকের ব্যবধানে দেশে দৈনিক গ্যাস উৎপাদন কমেছে ১০০ কোটি ঘনফুটের বেশি। ২০১৭ (2017) সালে দিনে ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন করা হয়েছে। এর পর থেকেই এটি কমতে শুরু করে। ২০১৮ (2018) সাল থেকে শুরু হয় এলএনজি আমদানি। এখন আমদানি ও দেশীয় উৎপাদন মিলে দিনে সর্বোচ্চ ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা যায়। অবকাঠামো না থাকায় আমদানি বাড়ানোর সুযোগ নেই। চাইলেও সরবরাহ বাড়ানো যাবে না। তাই বিকল্প উপায় খুঁজছে সরকার। বর্তমানে দেশে সর্বোচ্চ ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হলেও এর বড় অংশই আসছে এলএনজি আমদানি থেকে। কক্সবাজারের মহেশখালীতে থাকা দুটি ভাসমান টার্মিনালের গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা ১১০ কোটি ঘনফুট এবং সেখান থেকে সর্বোচ্চ ১০৫ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা হতো। তবে একটি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় বর্তমানে সরবরাহ ৫০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে এসেছে, যা দেশজুড়ে গ্যাস সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে। গ্যাস সংযোগ বন্ধের এই সিদ্ধান্ত অবশ্য দেশে নতুন নয়। এর আগে গ্যাস সংকটের কারণে ২০০৯ সালের ২১ জুলাই থেকে শিল্প ও বাণিজ্যিক এবং ২০১০ সালের ১৩ জুলাই থেকে আবাসিক গ্যাস সংযোগ বন্ধ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি কিছু কারখানায় সংযোগ দিলেও তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত কমিটি তিতাস গ্যাসের ২৫টি সংযোগ অনুমোদন করলেও পরে সেই কমিটিও বিলুপ্ত করা হয়। সম্প্রতি বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ১৭ মে সচিবালয়ে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকেও বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হলেও কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়নি। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, গ্যাসের অভাবে দেশের অর্ধেকের বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং অধিকাংশ সার কারখানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে নতুন সংযোগ দেওয়া হলে সংকট আরও বাড়বে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, সংযোগ না দেওয়ার এই সিদ্ধান্ত সাময়িক। সরকার ভোলার গ্যাস ঢাকায় আনা এবং মালয়েশিয়া থেকে বিশেষ কন্টেইনারে (আইএসও ট্যাংক) এলএনজি আমদানিসহ একাধিক বিকল্প নিয়ে কাজ করছে। সরবরাহ বাড়লে ডিমান্ড নোটের টাকা জমা দেওয়া গ্রাহকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সংযোগ দেওয়া হবে। তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা এই সংকট দ্রুত কাটার বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিম বলেন, যারা ব্যাংক ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করেছেন ও ডিমান্ড নোটের টাকা জমা দিয়েছেন, সংযোগ না পেলে তারা দেউলিয়া হয়ে যেতে পারেন। তাই দ্রুত সরবরাহ বাড়ানোর বিকল্প নেই। তিনি মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এলএনজি টার্মিনালের চুক্তি বাতিল করা সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল না। এছাড়া মালয়েশিয়া থেকে এলএনজি আমদানির বিষয়ে এক কর্মকর্তা জানান, আইএসও ট্যাংকের অবকাঠামো তৈরি করতেই এক বছর লাগবে এবং এর মাধ্যমে দৈনিক মাত্র ১ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাবে, যা দিয়ে একটি বড় কারখানার চাহিদাও মিটবে না। তবে শুধু টার্মিনাল নির্মাণ করলেও আমদানি থেকে সরবরাহ বাড়ানো যাবে না। গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি জিটিসিএল বলছে, মহেশখালী থেকে এলএনজি আনার জন্য দুটি সমান্তরাল পাইপলাইন আছে। পাইপলাইন দুটি এসেছে চট্টগ্রামের আনোয়ারায়। এ দুটি পাইপলাইন দিয়ে ১৭০ (170) কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা যাবে। কিন্তু আনোয়ারা স্টেশন থেকে পরবর্তী পাইপলাইন দুটি সরু, অর্থাৎ ব্যাস কম। এ দুটিতে ১১০ কোটি ঘনফুটের বেশি সরবরাহ করা যাবে না। আর গ্যাসের ব্যবহার মূলত আনোয়ারার পর থেকেই শুরু হয়। তাই সরবরাহ বাড়াতে নতুন পাইপলাইন নির্মাণ করতে হবে। পেট্রোবাংলার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের মোট গ্যাসের ৪১ শতাংশ বিদ্যুৎ খাতে, ৩৬ শতাংশ শিল্পে, ১১ শতাংশ গৃহস্থালিতে, 6 শতাংশ সারে, ৫ শতাংশ সিএনজিতে এবং ১ শতাংশ চা খাতে ব্যবহৃত হয়। নতুন প্রতিশ্রুত সংযোগগুলো দিতে গেলে আরও দৈনিক ৩৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হবে, যার কোনো সংস্থান এখন নেই। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য সরকার পর্যায়ক্রমে ১০০টি নতুন কূপ খনন এবং সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের দরপত্র আহ্বানের পরিকল্পনা নিয়েছে। SHARES জাতীয় বিষয়: এলএনজি আমদানিগ্যাস-সংকটজ্বালানি বিভাগপেট্রোবাংলাশিল্প সংযোগ