ওয়াশিংটন সফরে নেতানিয়াহু: আর কি কাজ করছে না তাঁর ‘ট্রাম্পকার্ড’?

প্রকাশিত: 4:40 PM, July 29, 2026

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকার সঙ্গে তাঁর গভীর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সম্পর্কের কথা প্রচার করে আসছেন। এর মাধ্যমে তিনি ইসরায়েলিদের বোঝাতে চান যে দেশের নেতৃত্বে তাঁর কোনো বিকল্প নেই। শৈশব ও কৈশোরের একটি বড় সময় যুক্তরাষ্ট্রে কাটানো নেতানিয়াহু মার্কিন রাজনীতিতে নিজের বিশেষ প্রভাব খাটিয়ে একের পর এক প্রেসিডেন্টকে প্রভাবিত করেছেন বলে মনে করা হয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁর সেই বহুল আলোচিত ‘ট্রাম্পকার্ড’ আর আগের মতো কার্যকর নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। এমন এক সময়ে তিনি ওয়াশিংটন সফর করছেন, যখন যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে।

একটা সময় মনে করা হতো, অতীতের সব মার্কিন প্রেসিডেন্টের তুলনায় ডোনাল্ড ট্রাম্পই ইসরায়েল ও বিশেষ করে নেতানিয়াহুর প্রতি সবচেয়ে বেশি সহানুভূতিশীল। ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক অভিযানে অংশ নিতে ট্রাম্পের সম্মতি সেই ধারণাকে আরও জোরালো করেছিল। তবে বর্তমানে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ স্থবির হয়ে পড়া এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলকে এড়িয়ে তেহরানের সঙ্গে ট্রাম্পের সমঝোতার আগ্রহ বাড়ায় এই সম্পর্কে ফাটল দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলবিরোধী সমালোচনা তীব্র হওয়ায় নেতানিয়াহুর প্রভাব নিয়ে নতুন করে সংশয় তৈরি হয়েছে।

নেতানিয়াহুর এই ওয়াশিংটন সফরকে তাঁর ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের একটি চেষ্টা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। লন্ডনের কিংস কলেজের যুদ্ধবিষয়ক বিভাগের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক আহরন ব্রেগম্যান বলেন, ভুল বা সঠিক যা-ই হোক না কেন, যুক্তরাষ্ট্রে অনেকের ধারণা নেতানিয়াহুই ট্রাম্পকে এমন একটি যুগে জড়িয়েছেন, যা এড়ানো সম্ভব ছিল। এই যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত কৌশলগত বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছে। তাই ট্রাম্পসহ কেউই এখন আর তাঁকে সবচেয়ে বিচক্ষণ নেতা হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ দেবেন না এবং সেই সময় শেষ হয়ে গেছে।

মার্কিন কংগ্রেসেও নেতানিয়াহুকে নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের প্রতি তাঁর নমনীয় অবস্থান এবং তাদের হাতে একজন মার্কিন সিনেটরকে বিচারবহির্ভূতভাবে আটক করার ঘটনা ওয়াশিংটনে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। এছাড়া তুরস্কের কাছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রি এবং সৌদি আরবের সঙ্গে পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতি দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন বাড়িয়েছে। তুরস্কের কাছে এফ-৩৫ বিক্রি নিয়ে নেতানিয়াহুর প্রকাশ্য আপত্তির জবাবে ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, তাঁদের কী বিক্রি করা উচিত, তা অন্য কেউ বলে দিতে পারে না।

ইসরায়েলের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও নিউইয়র্কে দেশটির সাবেক কনসাল জেনারেল অ্যালন পিঙ্কাস আল-জাজিরাকে জানান, রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলই নেতানিয়াহুর এই সফরের মূল লক্ষ্য। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি দাবি করছেন যে তাঁর সদ্য প্রয়াত বন্ধু ও রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের শেষকৃত্যে যোগ দিতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন। পিঙ্কাসের মতে, এই সফরের উদ্দেশ্য দুটি—এক, ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট থাকার বার্তা দেওয়া এবং দুই, নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতি মামলায় ট্রাম্পের পক্ষ থেকে ক্ষমার আহ্বান আদায় করা। ২০২৫ সালের নভেম্বরে নেতানিয়াহুর পক্ষ নিয়ে ইসরায়েলে ট্রাম্পের নজিরবিহীন হস্তক্ষেপের দিকে ইঙ্গিত করেন পিঙ্কাস। নেতানিয়াহু হয়তো আশা করছেন, ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক সফল হলে তা তাঁর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে।

শুধু ডেমোক্র্যাটরাই নন, যুক্তরাষ্ট্রের ডানপন্থী শিবিরের প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও নেতানিয়াহুর কড়া সমালোচনা করছেন। তাঁদের মধ্যে আছেন জনপ্রিয় পডকাস্ট উপস্থাপক টাকার কার্লসন এবং সাবেক রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য মার্জোরি টেইলর গ্রিন। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের সমালোচনা করে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে তাঁর মধ্যস্থতায় হওয়া চুক্তি ভেস্তে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন ইসরায়েলি কর্মকর্তারা।

ইসরায়েলি জনমত জরিপকারী এবং ১৯৯০-এর দশকে নেতানিয়াহুর সাবেক সহযোগী মিচেল বারাক আল-জাজিরাকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নেতানিয়াহুর অতীত রেকর্ড খুবই ভালো।’ ট্রাম্প হয়তো প্রকাশ্যে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের প্রশংসা করবেন, কিন্তু গোপনে অন্য ইসরায়েলি নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে নতুন কাউকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সমর্থন দিতে পারেন। আগামী অক্টোবরের শেষে ইসরায়েলে জাতীয় নির্বাচন এবং দেশে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতি মামলার বিচারের মুখে এই সফর তাঁর রাজনৈতিক অস্তিত্বের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও আগের মতো যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন আদায় করা এবার তাঁর জন্য সহজ হবে না।