সার্জিও গোরের ঢাকা সফর: আড়ালে কি পরাশক্তিদের কৌশলগত চাপ?

প্রকাশিত: 11:44 AM, August 3, 2026

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরের এক মাসের মাথায় বাংলাদেশে তিন দিনের সফর শেষ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গোর। ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই বিশেষ দূতের সফরকে ঘিরে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মহলে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক সমীকরণে বাংলাদেশ কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের মতো পরাশক্তিগুলোর বৈপরীত্য ও চাওয়া-পাওয়া সমন্বয় করবে, তা নিয়েই মূলত এই সফরে হিসাবনিকাশ করা হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কেউ কেউ একে বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন কৌশলগত চাপ হিসেবেও দেখছেন।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সার্জিও গোরের এই সফরে বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থ বা চাওয়া-পাওয়া খুব একটা গুরুত্ব পায়নি; বরং যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব এজেন্ডা ও চাহিদাই প্রাধান্য পেয়েছে। বিশেষ করে, সফরে এসে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে সার্জিও গোরের একান্ত বৈঠক নিয়ে নানা সমালোচনা ও সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই বৈঠকটি প্রথাগত নিয়মের বাইরে না হলেও এর মাধ্যমে আবারও ভারতকে মধ্যস্থতাকারী রেখে বা ভারতের চোখ দিয়ে বাংলাদেশকে দেখার মার্কিন প্রবণতা প্রকাশ পেয়েছে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমদ এ বিষয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা ও বার্তা পৌঁছে দেওয়াই ছিল সার্জিও গোরের সফরের মূল লক্ষ্য। বিশেষ করে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি স্মরণ করিয়ে দেওয়া এবং প্রধানমন্ত্রীর চীন ও মালয়েশিয়া সফরের দ্বিপক্ষীয় আলোচনার বিষয়ে ওয়াশিংটনের কৌতূহল ছিল বেশি। এছাড়া ইরান ইস্যুতে বাংলাদেশকে পাশে পাওয়া এবং মার্কিন বিনিয়োগ বা কেনাকাটার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর ড. খলিলুর রহমানের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি দেখা গেছে। পাশাপাশি ভারতের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে গোরের বৈঠককে 'আনইউজুয়াল' বা অস্বাভাবিক আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, এর মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে কোনো সমন্বয় করা হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন ওঠে। তবে বাংলাদেশ নিজের জাতীয় স্বার্থে সবার সঙ্গেই সুসম্পর্ক রাখবে। বর্তমানে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক একটি অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে, যা কারও জন্যই সুখকর নয়।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার প্রথমবার তিন দিনের সফরে বাংলাদেশে আসেন সার্জিও গোর। ঢাকায় পৌঁছেই তিনি রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে প্রায় এক ঘণ্টা বৈঠক করেন। বৈঠকে বাণিজ্য, জ্বালানি ও বিনিয়োগের মতো বিষয়গুলো স্থান পায়। বৈঠক শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, দুই দেশের সম্পর্ক ইতিবাচক দিকে যাচ্ছে এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। সার্জিও গোরও তার এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে বৈঠকটিকে ফলপ্রসূ বলে উল্লেখ করেন। সফরের দ্বিতীয় দিন শুক্রবার সকালে তিনি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থীশিবির পরিদর্শনে যান এবং বিকেলে রাজধানীর একটি হোটেলে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে বৈঠক করেন।

সফরের শেষ দিনে বিশেষ দূত সার্জিও গোর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে মার্কিন বিনিয়োগ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান এবং বিশেষ করে ওয়্যার হাউজিং, সয়াবিন, তুলা, গম ও কৃষি খাতের পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) খাতে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও বিনিয়োগে আগ্রহ দেখানোর পাশাপাশি শিগগিরই একটি মার্কিন বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করবে বলে জানানো হয়। তবে বিশ্লেষকরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, মার্কিন বিনিয়োগ দেশের অর্থনীতিকে চাঙা করলেও যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হলো বাংলাদেশ যেন কোনোভাবেই চীনের দিকে বেশি ঝুঁকে না পড়ে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবিরের মতে, পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে কাজ করার সময় এমন চাপ আসা স্বাভাবিক। তবে এই চাপ সামলানোর একমাত্র পথ হলো অভ্যন্তরীণভাবে নিজেদের শক্তিশালী করা। রাজনৈতিক সহমর্যাদা বৃদ্ধি, সুশাসন ও অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি ঘটাতে পারলে বৃহৎ শক্তির কাছ থেকে নিজেদের সুবিধা আদায় করা সম্ভব হবে।

অন্য এক বিশ্লেষক ও সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান মনে করেন, সার্জিও গোরের এই সফর বাংলাদেশকে আবারও সেই পুরোনো সমীকরণে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ভারতীয় প্রিজম দিয়ে বাংলাদেশকে দেখত। তিনি বলেন, এই সফরে বাংলাদেশের নিজস্ব অগ্রাধিকারের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষার্থেই বেশি আগ্রহ দেখা গেছে। বাংলাদেশকে এখন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগের অপেক্ষায় না থেকে নিজস্ব এজেন্ডা নিয়ে এগোতে হবে। অন্যথায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক থেকে কাঙ্ক্ষিত লাভ আসবে না। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া বাণিজ্য চুক্তি পর্যালোচনা করা এবং সামরিক বা কৌশলগত চুক্তির ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক থাকা প্রয়োজন। এই সফর ঢাকাকে যেমন ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি নিয়ে নতুন করে ভাবতে শেখাবে, তেমনি ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রয়োজনীয়তাও মনে করিয়ে দেবে।