১৬ বছরের স্বৈরশাসনের অবসান: যেভাবে পতন ঘটল শেখ হাসিনার প্রকাশিত: 10:31 AM, August 5, 2026 ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ ও তীব্র প্রতিরোধের মুখে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রায় ১৬ বছরের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটে এবং দেশ এক ফ্যাসিবাদী শাসনের কবল থেকে মুক্তি পায়। অথচ নিজের দীর্ঘ শাসনামলে তিনি বহুবার অহংকার করে উঁচু গলায় বলেছিলেন, ‘শেখ হাসিনা পালায় না’। এমনকি ২০২৪ সালের ২২ জুলাই ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকেও তিনি এই কথা পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন। কিন্তু সেই বক্তব্যের মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেই জনগণের তীব্র প্রতিরোধ, প্রচণ্ড ঘৃণা ও গণআন্দোলনের মুখে তিনি পদত্যাগ করে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। ৫ আগস্টের এই বিজয় বাংলাদেশের জনগণের জন্য একদিকে যেমন গৌরবের, অন্যদিকে ততটাই মর্মান্তিক। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তথ্য অনুযায়ী, এই অর্জনে রয়েছে হাজারো শহীদের আত্মত্যাগ, ২৩ হাজারেরও বেশি মানুষের আহত হওয়া, সাত শতাধিক মানুষের দৃষ্টিশক্তি হারানো এবং হাজারো মানুষের পঙ্গুত্ববরণ। এছাড়া অসংখ্য শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের কারাবরণ ও নির্যাতনের ইতিহাসও এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। হাসিনার সরকারের পতনের পরও অনুগত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠন যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সশস্ত্র ক্যাডারদের হামলায় বহু মানুষ প্রাণ হারান। এসব ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারিক কার্যক্রম চলছে। ট্রাইব্যুনাল ইতোমধ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধের ৬টি মামলায় রায় ঘোষণা করেছে, যেখানে ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড ও ১১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে। চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠনের পর অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে এসব সংবেদনশীল মামলার রায় প্রদান করা হয়েছে এবং অন্য মামলাগুলোও বিচারের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। শেখ হাসিনা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করেছিলেন। ৫ আগস্ট রাজধানীর প্রবেশপথগুলোতে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষ হয় এবং দুপুরের দিকে হাজার হাজার মানুষ শাহবাগে জড়ো হতে থাকেন। শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করার পরও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রাজধানীসহ সারা দেশে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালায়, যাতে অনেক মানুষ নিহত ও আহত হন। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তিনি মানবাধিকার লঙ্ঘন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলোপের মাধ্যমে ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছিলেন। বিশেষ করে ২০১৪ সালের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন, ২০১৮ সালের ‘রাতের ভোট’ এবং ২০২৪ সালের ‘আমি-ডামি’ নির্বাচন তার শাসনামলের কলঙ্কিত অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত। ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া কোটা সংস্কার আন্দোলনই শেষ পর্যন্ত সফল গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়, যা ৩৬ জুলাই আন্দোলন হিসেবে পরিচিতি পায়। ২০১৮ সালে সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলের প্রজ্ঞাপন থাকলেও ২০২৪ সালের জুনে হাইকোর্ট তা অবৈধ ঘোষণা করলে শিক্ষার্থীরা নতুন করে রাজপথে নামে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার পর আন্দোলন সারা দেশে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, এই আন্দোলনে প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত এবং ২০,০০০ মানুষ আহত হন। আন্দোলন চলাকালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা ৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণা করেন। এরপর ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়। ঐতিহাসিক সেই দিনে লাখ লাখ মানুষ রাজপথে নেমে এলে শেখ হাসিনা বুঝতে পারেন তার বিদায়ের সময় হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ছোট বোন শেখ রেহানাকে সঙ্গে নিয়ে তিনি একটি সামরিক হেলিকপ্টারে করে ভারতের উদ্দেশে দেশত্যাগ করেন। এই আন্দোলনে ‘কোটা না মেধা? মেধা!’, ‘দফা এক, দাবি এক, হাসিনা সরকারের পতন!’ এবং লন্ডনে নির্বাসিত থাকা অবস্থায় তারেক রহমানের ‘যদি তুমি ভয় পাও, তবে তুমি শেষ; যদি তুমি রুখে দাঁড়াও-তবেই তুমি বাংলাদেশ’ ও ‘টেক ব্যাক বাংলাদেশ’ স্লোগানগুলো আন্দোলনকারীদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। SHARES রাজনীতি বিষয়: গণঅভ্যুত্থানছাত্র আন্দোলনবাংলাদেশশেখ হাসিনা৫ আগস্ট