ফুরিয়ে আসছে গ্যাসের রিজার্ভ, আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকিতে জ্বালানি খাত

প্রকাশিত: 9:18 AM, August 7, 2026

বাংলাদেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের রিজার্ভ দ্রুত ফুরিয়ে আসছে, যা দেশের জ্বালানি খাতের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রায় এক যুগ ধরে চলা এই গ্যাস সংকট সাম্প্রতিক সময়ে আরও তীব্র রূপ নিয়েছে। শিল্প-কারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সিএনজি স্টেশন ও আবাসিক খাতে এর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর থেকে আবিষ্কৃত ২৯টি গ্যাসক্ষেত্রের মোট ২৯ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) গ্যাসের মধ্যে ইতোমধ্যে ২০ টিসিএফের বেশি উত্তোলন করা হয়েছে। ফলে অবশিষ্ট উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে এসেছে।

পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, গত এক দশকে অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। নতুন কোনো বড় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত না হওয়ায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ সচল রাখতে সরকার অত্যন্ত ব্যয়বহুল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানি শুরু হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের কারণে এটি দেশের অর্থনীতির ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু এলএনজি আমদানির মাধ্যমে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়; বরং স্থলভাগ ও গভীর সমুদ্রে নতুন গ্যাস অনুসন্ধানে জোরদার বিনিয়োগ জরুরি।

এদিকে গত ২১ জুলাই মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন লেগে বিকল হয়ে যাওয়ার পর থেকে গত দুই সপ্তাহে দেশের হাজার হাজার শিল্প-কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল। এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ সচিবালয়ে সাংবাদিকদের জানান, যান্ত্রিক ত্রুটি সমাধান করে ভাসমান এলএনজি টার্মিনালটি (এফএসআরইউ) পুনরায় গ্যাস সরবরাহ শুরু করেছে। এর ফলে আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যে গ্যাসের পরিস্থিতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

গ্যাস সংকটের কারণে দেশজুড়ে চলমান লোডশেডিং নিয়ে মন্ত্রী বলেন, গ্যাস সরবরাহ না থাকলে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতেও উৎপাদন ব্যাহত হওয়া স্বাভাবিক। এ ছাড়া বিদ্যুতের অতিরিক্ত বা 'ভূতুড়ে' বিল প্রসঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নিয়ে কেউ তাদের কাছে আসেন না। তিনি এক সাংবাদিকের ফেসবুক পোস্টের উদাহরণ দিয়ে জানান, সাড়ে ৩ হাজার টাকার বিল ৭ হাজার টাকা হওয়ার অভিযোগ তদন্ত করে দেখা গেছে, ওই গ্রাহক দুটি এসি, ফ্রিজ ও ব্লেন্ডার চালান। এত সরঞ্জাম চালানোর পরও ৭ হাজার টাকা বিলকে তিনি বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম বলে দাবি করেন।

can অন্যদিকে, ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে পাইপলাইনের মাধ্যমে আরও বেশি পরিমাণে ডিজেল আমদানির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে মন্ত্রী জানান। বৈঠকে সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেন, শেখ হাসিনা দেশটাকে ধ্বংস করে দিয়ে গেছেন।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম তামিম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক বদরুল ইমাম দীর্ঘদিন ধরে নতুন অনুসন্ধান কার্যক্রমে বড় বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোকে (আইওসি) আকৃষ্ট করার তাগিদ দিয়ে আসছেন। সরকার বর্তমানে বাপেক্সের মাধ্যমে নতুন কূপ খনন, নতুন উৎপাদন বণ্টন চুক্তি (পিএসসি) নীতিমালার মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং একাধিক ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বড় কোনো নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত না হলে দেশীয় উৎপাদন আরও কমবে এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা আরও বৃদ্ধি পাবে।