অভিনয় থেকে পরিচালনা: রূপালি পর্দায় কাজী নজরুল ইসলামের পদচারণা প্রকাশিত: ১১:১০ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ২৭, ২০২৬ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর সৃষ্টিশীল জীবনে শুধু কবিতা, গান, নাটক বা গল্পেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; চলচ্চিত্রের রূপালি জগতেও তিনি রেখে গেছেন গভীর ও বৈচিত্র্যময় প্রতিভার স্বাক্ষর। তিনি একাধারে ছিলেন চলচ্চিত্রের কাহিনিকার, গীতিকার, সুরকার, সংগীত পরিচালক, পরিচালক এবং দাপুটে অভিনেতা। আজীবন চঞ্চল ও অস্থির স্বভাবের এই মানুষটি সৃষ্টির ক্ষেত্রে ছিলেন অত্যন্ত নিমগ্ন। তিনি শুধু নিজে কাজই করেননি, সহশিল্পীদের অভিনয় শেখানো, গান তুলে দেওয়া এবং শুদ্ধ উচ্চারণ শিখিয়ে দেওয়ার মতো প্রশিক্ষকের ভূমিকাও পালন করেছেন নিপুণভাবে। ত্রিশের দশকে পার্সি মালিকানাধীন বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ম্যাডান থিয়েটার্সে গুরুত্বপূর্ণ 'সুর ভাঙারি' পদে নিযুক্ত হন নজরুল। অভিনয় ও পরিচালনার পাশাপাশি তিনি চলচ্চিত্র প্রযোজনাতেও যুক্ত ছিলেন। ১৯৩৩ সালে তৎকালীন নামকরা প্রযোজক পিরোজ ম্যাডান 'পায়োনিয়ার ফিল্মস কোম্পানি' প্রতিষ্ঠা করলে সেখান থেকে গিরিশচন্দ্র ঘোষের 'ধ্রুব চরিত' অবলম্বনে 'ধ্রুব' নামের একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। এই ছবির গান লেখার পাশাপাশি সংগীত পরিচালনা করেন নজরুল। শুধু তাই নয়, ছবিতে দেবর্ষি নারদের চরিত্রে অভিনয় করে তিনি সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন এবং একটি গানে কণ্ঠও দেন। ১৯৩৪ সালের ১ জানুয়ারি মুক্তিপ্রাপ্ত 'ধ্রুব' চলচ্চিত্রে নজরুল নিজেকে এক অভিনব রূপে উপস্থাপন করেছিলেন। সাধারণত পর্দায় নারদ চরিত্রটিকে জটাধারী, দীর্ঘ দাড়িওয়ালা বৃদ্ধ হিসেবে দেখানো হলেও নজরুলের নারদ ছিলেন ক্লিন শেভড, সুদর্শন ও সদা হাস্যময় এক যুবক। মাথায় চূড়ো করে মালা বাঁধা ঝাঁকড়া চুল, পরনে সিল্কের লম্বা কুর্তা আর গলায় মালা পরিহিত এই নারদকে নিয়ে সে সময় পত্রপত্রিকায় বেশ সমালোচনা হয়েছিল। তবে নজরুল সেই সমালোচনার জবাবে বলেছিলেন, 'আমি চিরতরুণ ও চিরসুন্দর নারদের রূপই দেওয়ার চেষ্টা করেছি।' পরবর্তীতে ১৯৩৪ সালেই ম্যাডান থিয়েটার্স নজরুলের প্রাপ্য সম্মানী নিয়ে প্রতারণা করায় তিনি প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। পরিচালক হিসেবেও নজরুলের ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। তিনি নিজে 'ধূপছায়া' নামের একটি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন এবং সেখানে দেবতা বিষ্ণুর চরিত্রে অভিনয় করেন। এর আগে ১৯৩১ সালের ১১ এপ্রিল জেএফ ম্যাডান কোম্পানির সবাক চিত্র 'জামাইষষ্ঠী' ক্রাউন সিনেমা হলে মুক্তি পায়। অমর চৌধুরী পরিচালিত এই চলচ্চিত্রে সুরকারের দায়িত্ব পালন করেছিলেন নজরুল। একই বছর মুক্তিপ্রাপ্ত অন্য একটি সবাক চলচ্চিত্র 'জলসা'-তে তিনি নিজের একটি গান গাওয়ার পাশাপাশি 'নারী' কবিতাটি আবৃত্তি করেছিলেন। কাহিনিকার ও সুরকার হিসেবেও নজরুলের সাফল্য ছিল আকাশচুম্বী। ১৯৩৯ সালে দেবকী বসুর পরিচালনায় মুক্তি পায় বেদে সম্প্রদায়ের জীবনভিত্তিক চলচ্চিত্র 'সাপুড়ে'। ছবিটির কাহিনিকার ও সুরকার ছিলেন নজরুল। এই সিনেমার তথ্য সংগ্রহের জন্য তিনি বেশ কিছুদিন বেদে দলের সঙ্গেও কাটিয়েছিলেন। দারুণ ব্যবসাসফল এই সিনেমাটির হিন্দি রিমেক 'সাপুড়া'-র সঙ্গেও তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন। এছাড়া ১৯৩৫ সালে কয়লাখনির শ্রমিকদের জীবনসংগ্রাম নিয়ে নির্মিত শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় ও নজরুলের যৌথ গীতিকবিতায় 'পাতালপুরী' সিনেমার সংগীত পরিচালনা করেন নজরুল। এই ছবির জন্য তিনি কয়লাখনি অঞ্চলে গিয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন এবং 'ঝুমুর' সুরে গান তৈরি করেন। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কাহিনি অবলম্বনে ১৯৩৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত 'গৃহদাহ' সিনেমার সুরকার ছিলেন তিনি, যার সংগীত পরিচালক ছিলেন রাইচাঁদ বড়াল। ১৯৩৭ সালে রহস্য ঘরানার চলচ্চিত্র 'গ্রহের ফের'-এর সংগীত পরিচালক ও সুরকার হিসেবেও কাজ করেন নজরুল। ১৯৩৭ সালের অন্যতম আলোচিত চলচ্চিত্র 'বিদ্যাপতি'-র মূল গল্পটি ছিল নজরুলের লেখা, যদিও এর চিত্রনাট্য, সংলাপ ও পরিচালনা করেছিলেন দেবকী বসু। মধ্যযুগের বৈষ্ণব কবি বিদ্যাপতির জীবনীভিত্তিক এই ছবির সুরকার ছিলেন নজরুল ও রাইচাঁদ বড়াল। বাংলায় বিপুল সফলতার পর ছবিটি হিন্দিতেও নির্মিত হয় এবং সেখানেও ব্যাপক সাড়া ফেলে। ১৯৩৮ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত 'গোরা' চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালক ছিলেন নজরুল। সে সময় বিশ্বভারতী আপত্তি তোলে যে ছবিতে রবীন্দ্রসংগীত সঠিকভাবে গাওয়া হচ্ছে না। নজরুল সরাসরি রবীন্দ্রনাথের কাছে গেলে কবিগুরু তাঁকে সমর্থন করে বলেন, 'আমার গান কীভাবে গাইতে হবে, সেটা কি তোমার চেয়ে ওরা ভালো বুঝবে?' রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে নিজের খুশিমতো গান ব্যবহারের লিখিত অনুমতি দেন। নজরুল এই ছবিতে রবীন্দ্রসংগীতের পাশাপাশি নিজের লেখা গান এবং বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'বন্দে মাতরম' গানটি ব্যবহার করেন। একই সময়ে 'হাল বাংলা' নামের চলচ্চিত্রে সুর করার পাশাপাশি একটি কৌতুক চরিত্রে অভিনয়ও করেন তিনি। ১৯৪২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত 'চৌরঙ্গী' চলচ্চিত্রের গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক ছিলেন নজরুল। পরবর্তীতে ছবিটির হিন্দি সংস্করণের জন্য তিনি সাতটি হিন্দি গান লেখেন। একই বছর মুক্তিপ্রাপ্ত 'দিলরুবা' চলচ্চিত্রের গীতিকার ও সুরকার ছিলেন তিনি। ১৯৪১-৪২ সালে 'মদিনা' নামের একটি চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য, গান ও সুরের দায়িত্ব সামলান তিনি এবং ছবিটির জন্য ১৫টি গান লেখেন। তবে ১৯Check২ সালে নজরুল গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ায় চলচ্চিত্রটি আর আলোর মুখ দেখেনি। চলচ্চিত্র ব্যবসায় নজরুলের সম্পৃক্ততা ছিল সরাসরি। ১৯৪১ সালে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি 'বেঙ্গল টাইগার্স পিকচার্স' নামে একটি চলচ্চিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এই উদ্যোগে তাঁর সঙ্গে অংশীদার হিসেবে ছিলেন আব্বাসউদ্দীন আহমদ, ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরু, হুমায়ূন কবীর, এস ওয়াজেদ আলী, মোহাম্মদ মোদাব্বের, আজিজুল ইসলাম, সারওয়ার হোসেন ও আজিজুল হকসহ অনেকে। ১৯৭৬ সালে কাজী নজরুল ইসলামের মৃত্যুর পর এবং তাঁর অসুস্থতাকালীন সময়েও বহু চলচ্চিত্রে তাঁর গান সফলভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। অনেক সময় তাঁর বা তাঁর উত্তরাধিকারীদের অনুমতি ছাড়াই গান ব্যবহার করা হলেও দর্শকহৃদয়ে তা বিপুল সাড়া ফেলে। 'নবাব সিরাজউদ্দৌলা' চলচ্চিত্রে 'পথহারা পাখি কেঁদে ফেরে একা', জহির রায়হানের 'জীবন থেকে নেয়া' চলচ্চিত্রে 'কারার ঐ লৌহকপাট' এবং 'লায়লা-মজনু' চলচ্চিত্রে 'লাইলি তোমার এসেছে ফিরিয়া, মজনু গো আঁখি খোলো' গানগুলোর ব্যবহার ছিল অত্যন্ত সার্থক ও জনপ্রিয়। পরবর্তী সময়ে নজরুলের সাহিত্যকর্ম অবলম্বনেও বেশ কিছু চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। ২০০৬ সালে তাঁর 'মেহের নেগার' গল্প অবলম্বনে যৌথভাবে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন মুশফিকুর রহমান ও মৌসুমী, যেখানে মেহের নেগার চরিত্রে মৌসুমী এবং আফগান যুবক ইউসুফের চরিত্রে ফেরদৌস অভিনয় করেন। নজরুলের গল্প অবলম্বনে মতিন রহমান নির্মাণ করেন 'রাক্ষুসী', যাতে অভিনয় করেন রোজিনা, পূর্ণিমা ও ফেরদৌস। এর আগে বাপ্পারাজ অভিনীত 'জ্বিনের বাদশাহ' চলচ্চিত্রটিও নজরুলের গল্প অবলম্বনে তৈরি। এছাড়া তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস 'মৃত্যুক্ষুধা', গল্প 'ব্যথার দান' ও 'পদ্মগোখরা' নিয়েও চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। শিশুদের জন্য বাংলাদেশ শিশু একাডেমি থেকে নজরুলের দুটি জনপ্রিয় কবিতা 'লিচু-চোর' এবং 'খুকী ও কাঠবেরালি' অবলম্বনে দুটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়। SHARES বিনোদন বিষয়: কাজী নজরুল ইসলামচলচ্চিত্র পরিচালনাধ্রুব চলচ্চিত্রনজরুলসংগীতবাংলা চলচ্চিত্র