অহংকার যেভাবে মানুষের পতন ডেকে আনে প্রকাশিত: ১:০২ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১০, ২০২৬ মানবজীবনের সমস্ত সৎ গুণাবলির সমষ্টি, ইহ-পরকালের পরম আশ্রয় এবং মুক্তির একমাত্র চাবিকাঠি হলো তাকওয়া। পক্ষান্তরে, মানুষের আধ্যাত্মিক ও জাগতিক পতনের সবচেয়ে বড় কারণ হলো অহংকার। অনেক সময় অবচেতনভাবেই মানুষের মনে অন্যের চেয়ে নিজেকে শ্রেষ্ঠ ভাবার প্রবণতা তৈরি হয়। "আমি তার চেয়ে উত্তম বা যোগ্য"—এই একটি অনুভূতিই মানুষকে ধীরে ধীরে ধ্বংসের অতল গহ্বরে ঠেলে দেয়। মূলত এটি আল্লাহর সুনিপুণ বণ্টন ও অসীম হিকমতের ওপর এক ধরণের গোপন আপত্তি প্রকাশের শামিল। অহংকার কেবল মুখের কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং মানুষের দৈনন্দিন আচরণেও নানাভাবে প্রকাশ পায়। অবজ্ঞাসূচক দৃষ্টি, তাচ্ছিল্যের হাসি, চড়া কণ্ঠস্বর কিংবা নীরব ঔদাসীন্যের মাধ্যমেও এই অহংবোধ প্রকাশ পেতে পারে। কর্মক্ষেত্রে বসের অধীনস্থদের প্রতি অবহেলা, ধনীর পক্ষ থেকে গরিবকে হীন মনে করা, কিংবা কোনো ধার্মিকের পাপিষ্ঠ ব্যক্তির প্রতি ঘৃণা—সবই অহংকারের ভিন্ন ভিন্ন রূপ। এমনকি ধর্ম বা জ্ঞানের দোহাই দিয়ে নিজেকে একমাত্র সত্যের অধিকারী ভাবা এবং অন্য সবাইকে ভ্রান্ত মনে করাও এক প্রকার সূক্ষ্ম অহংকার। মানুষ ভুলে যায় যে, সম্মান-অপমান, উত্থান-পতন এবং সৃষ্টির রিজিক নির্ধারণের একমাত্র মালিক মহান আল্লাহ। তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য যা ফায়সালা করেন, তা হিকমতের ওপর ভিত্তি করেই করেন। পবিত্র কোরআনের সুরা মুলকের ১৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি জানেন না? তিনি সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক অবগত।' তাই মানুষের উচিত আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতকে অন্যের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করার হাতিয়ার না বানিয়ে সর্বদা সন্তুষ্ট থাকা। ইসলামে অহংকার পরিহারের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন হযরত ইউসুফ (আ.)। অসীম জ্ঞান ও মর্যাদার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তিনি নিজেকে অন্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ দাবি করেননি। বরং অত্যন্ত বিনয়ের সাথে দেশের কল্যাণে নিজের দায়িত্বশীলতা প্রকাশ করে বলেছিলেন, 'আমাকে দেশের ধনভাণ্ডারের ওপর কর্তৃত্ব প্রদান করুন; আমি তো উত্তম রক্ষক, সুবিজ্ঞ।' (সুরা ইউসুফ : ৫৫)। নিজের যোগ্যতা দেশের সেবায় বিলিয়ে দেওয়ার এই মানসিকতা অহংকার নয়, বরং বিনয়ী মানুষের আত্মবিশ্বাস। সামাজিক জীবনে অহংকারের কুফল অত্যন্ত ভয়াবহ। এটি পারস্পরিক সম্পর্কের সেতু ভেঙে দেয় এবং সমাজে হিংসা, বিদ্বেষ ও প্রতিশোধের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, 'যার অন্তরে সরিষার দানার সমান অহংকারও থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।' (মুসলিম : ১৬৮)। প্রকৃত অর্থে অহংকার হলো সত্যকে অস্বীকার করা এবং মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করা। সুরা লুকমানের ১৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দিয়েছেন, 'অহংকারবশে তুমি মানুষকে অবজ্ঞা কর না এবং পৃথিবীতে উদ্ধতভাবে বিচরণ কর না; নিশ্চয়ই আল্লাহ কোন উদ্ধত, অহংকারীকে পছন্দ করেন না।' বিনয়ের গুরুত্ব তুলে ধরে আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, 'যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এক স্তর বিনয়ী হবে, আল্লাহ তার মর্যাদা এক স্তর উঁচু করবেন। আর যে অহংকার করবে, আল্লাহ তাকে হীনতম স্তরে নামিয়ে দেবেন।' (ইবনে মাজাহ : ৪১৭৬)। তাই অন্তরের অহংকার দূর করতে হলে সর্বদা বিনয়ী হতে হবে এবং অন্যের নেয়ামত দেখে হিংসা না করে দোয়া করতে হবে, 'হে আল্লাহ, তুমি তার জন্য বরকত দাও, আর আমাকে আমার ভাগ্যে সন্তুষ্ট রাখো।' একই সাথে নিজের অন্তরকে অহংকার, আত্মপ্রশংসা ও রিয়া থেকে মুক্ত রাখতে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা উচিত। SHARES অন্যান্য বিষয়: অহংকারইসলামী জীবনকোরআনতাকওয়াবিনয়হাদিস