জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দেশীয় কয়লা উত্তোলনে ১০ বছরের মহাপরিকল্পনা প্রকাশিত: ৯:০৪ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১১, ২০২৬ দেশের সামগ্রিক জ্বালানি সংকট, আন্তর্জাতিক বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও জ্বালানি তেলের উচ্চ মূল্য এবং ডলার সংকটের কারণে সৃষ্ট বিদ্যুৎ উৎপাদন অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় দেশীয় কয়লা ব্যবহারের দিকে মনোযোগ বাড়াচ্ছে সরকার। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আগামী ১০ বছরে দেশের বিভিন্ন খনি থেকে মোট ৫৬৫ মিলিয়ন টন কয়লা উত্তোলনের মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি সম্প্রসারণ করে ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রায় ১৬ কোটি (১৬০ মিলিয়ন) টন কয়লা উত্তোলনের পরিকল্পনা রয়েছে। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির সম্প্রসারণের প্রাথমিক উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে জাতীয় কয়লানীতি বাস্তবায়নেরও লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। উত্তোলিত কয়লা দেশের অন্যান্য প্রান্তে সহজে পৌঁছে দিতে উত্তরাঞ্চল থেকে রেল যোগাযোগ গড়ে তোলার বিষয়টিও বিবেচনা করছে সরকার; প্রয়োজনে নতুন রেলপথ তৈরি করা হবে। এছাড়া কয়লা আমদানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের অবকাঠামোগত সুবিধা থাকায় কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে আরও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের চিন্তাও রয়েছে সরকারের নীতিনির্ধারকদের। সরকারি বিভিন্ন নথি ও গবেষণা অনুযায়ী, দেশের মাটির নিচে বড়পুকুরিয়া, ফুলবাড়ী, খালাশপীর, জামালগঞ্জ ও দীঘিপাড়াসহ পাঁচটি প্রধান কয়লাক্ষেত্রে প্রায় ৮ বিলিয়ন টন কয়লার মজুদ বা সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে। তবে ভূগর্ভে থাকা এই বিপুল পরিমাণের পুরোটাই অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগতভাবে উত্তোলনযোগ্য নয়। বর্তমানে একমাত্র বড়পুকুরিয়া ছাড়া অন্য কোনো কয়লাক্ষেত্র থেকে বাণিজ্যিক উত্তোলন শুরু হয়নি। ফলে বিপুল দেশীয় কয়লা মাটির নিচে পড়ে থাকলেও বিদ্যুৎকেন্দ্র সচল রাখতে বিপুল অর্থ ব্যয়ে আমদানিকৃত কয়লার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এই আমদানিনির্ভরতা আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা ও ডলার সংকটের কারণে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। বর্তমানে দেশে ৮টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াট। তবে কারিগরি ত্রুটি ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে প্রায়ই কোনো না কোনো কেন্দ্র বন্ধ থাকছে। কয়লা সংকটের কারণেও কেন্দ্রগুলো পুরোদমে চালানো সম্ভব হচ্ছে না। বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৫২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার তিনটি ইউনিট রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অধিকাংশ সময় অচল থাকায় খনি থেকে উত্তোলিত দেশীয় কয়লা পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না, যার ফলে কোল ইয়ার্ডে কয়লার স্তূপ জমছে। এই দেশীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ছাড়াও ভারতের ঝাড়খণ্ডে নির্মিত আদানির কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হয়। বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে চালু থাকা বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মধ্যে দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া (৫২৫ মেগাওয়াট), পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র (১,৩২০ মেগাওয়াট), রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র (১,৩২০ মেগাওয়াট), মহেশখালীর মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র (১,২০০ মেগাওয়াট) এবং বাঁশখালীর এসএস পাওয়ার প্ল্যান্ট (১,৩২০ মেগাওয়াট) অন্যতম। এছাড়া পটুয়াখালীতে আরপিসিএল নরিনকো কোম্পানির আরও একটি ১,২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। সব মিলিয়ে এসব কেন্দ্রের সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা ৫ হাজার ৭০০ মেগাওয়াটের বেশি। গ্যাসের সরবরাহ ঘাটতি ও তেলের উচ্চ মূল্যের কারণে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকে এখন তুলনামূলক স্থিতিশীল বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচের দিক থেকে দেশি গ্যাস সাশ্রয়ী হলেও এর তীব্র সরবরাহ সংকট রয়েছে। এলএনজি আমদানি করে ঘাটতি মেটাতে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ে। অন্যদিকে ফার্নেস অয়েল বা ডিজেলভিত্তিক কেন্দ্রের উৎপাদন ব্যয় আরও বেশি। আমদানি করা কয়লা দিয়ে উৎপাদিত বিদ্যুৎও তেলভিত্তিক উৎপাদনের চেয়ে কম ব্যয়বহুল। আর দেশি কয়লা ব্যবহার করা গেলে আমদানি ও পরিবহন ব্যয় কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ আরও কমানো সম্ভব। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কয়লার দাম কম হলেই বিদ্যুতের দাম কমবে না; কারণ কেন্দ্র নির্মাণের মূলধনী ব্যয়, ঋণের সুদ, ক্যাপাসিটি চার্জ এবং পরিচালন ব্যয়ও বিদ্যুতের মোট মূল্যের সঙ্গে যুক্ত হয়। দেশীয় কয়লা ব্যবহার বাড়াতে হলে খনি সম্প্রসারণের পাশাপাশি কয়লা পরিবহনের জন্য নির্ভরযোগ্য রেল লজিস্টিক অবকাঠামো তৈরি জরুরি। বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন, বড়পুকুরিয়া থেকে কয়লা উত্তোলন করে দেশের অন্যান্য বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে ব্যবহারের লক্ষ্যে রেল যোগাযোগ স্থাপনের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রেলপথে বিপুল পরিমাণ কয়লা পরিবহন করা গেলে সড়কপথের ওপর চাপ কমবে এবং পরিবহন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে। এর জন্য বিশেষ ওয়াগন, লোডিং-আনলোডিং ব্যবস্থা এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে সমন্বিত লজিস্টিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। আমদানি করা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে মাতারবাড়ীর গভীর সমুদ্রবন্দর ও কয়লা হ্যান্ডলিং অবকাঠামোকে বড় সুবিধা হিসেবে দেখছে সরকার। তবে দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় কয়লা অর্থনৈতিকভাবে উত্তোলনযোগ্য হলে তার ব্যবহার নিয়ে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়লা উত্তোলনের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক লাভের পাশাপাশি পরিবেশ, কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়গুলো গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে। বর্তমানে দেশে মোট বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা ১৩৭টি। এর মধ্যে ৬৪টি সরকারি, ৭০টি বেসরকারি এবং ৩টি যৌথ উদ্যোগে (ভারত ও চীনের সঙ্গে) পরিচালিত হচ্ছে। দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। আগামী দশকের কয়লানীতি ও বড়পুকুরিয়া সম্প্রসারণের সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে আমদানিনির্ভর কয়লা ও এলএনজির ঝুঁকি কমানো এবং দেশি জ্বালানি সম্পদের টেকসই ব্যবহারের মধ্যকার ভারসাম্যের ওপর। SHARES জাতীয় বিষয়: কয়লা উত্তোলনকয়লানীতিজ্বালানি সংকটবড়পুকুরিয়া কয়লাখনিবিদ্যুৎ উৎপাদনমাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র