শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ফিল্ম সোসাইটি: শিক্ষার্থীদের গল্প বলার সাহস

প্রকাশিত: ৭:১৫ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৬

গভীর রাতে একটি সিনেমা দেখার পর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফারহা তাহসিনের মনে হয়েছিল, সিনেমা কেবল ঘরে বসে একা দেখার বিষয় নয়। সিনেমা নিয়ে আলোচনা, পেছনের ভাবনাগুলো বোঝা এবং অন্যের সঙ্গে অনুভূতি ভাগাভাগি করে নেওয়াও চলচ্চিত্র উপভোগের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ফিল্ম সোসাইটি (এসএইউএফএস)। সংগঠনটির সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফারহা তাহসিনের মতে, সিনেমা হলো নিজের চিন্তা ও অনুভূতি অন্যের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি শক্তিশালী মাধ্যম।

শুরুতে কৃষিভিত্তিক একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিল্ম সোসাইটি কেন প্রয়োজন, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছিল। ফারহারা তখন আলোচনার চেয়ে কাজের মাধ্যমে নিজেদের উদ্দেশ্য স্পষ্ট করার পথ বেছে নেন। নবীনবরণ অনুষ্ঠানে কোর সদস্যরা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে বিষয়টি পরিষ্কার হয় যে এটি কেবল আড্ডার প্ল্যাটফর্ম নয়। এরপরই তারা কাজের অনুমতি পান। তাদের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল শিক্ষার্থীদের জন্য বড় পর্দায় ভালো সিনেমা দেখার এবং তা নিয়ে আলোচনার একটি পরিবেশ তৈরি করা।

প্রথম প্রদর্শনীটি ছিল তাদের জন্য বড় এক চ্যালেঞ্জ। ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের মিলনায়তনে বড় পর্দা, আসন বিন্যাস ও পপকর্নসহ সব আয়োজনে কাজ করতে হয়েছিল তাদের। রায়হান রাফীর ‘তাণ্ডব’ ও তানিম নূরের ‘উৎসব’ প্রদর্শনীতে সাড়ে সাত শ শিক্ষার্থী ও শিক্ষক অংশ নেন। সেই থেকে সংগঠনটির কার্যক্রম বিস্তৃত হয়েছে। এখন প্রতি বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক মিটিংয়ের পাশাপাশি চিত্রনাট্য, চিত্রধারণ ও সম্পাদনা নিয়ে নিয়মিত কর্মশালার আয়োজন করা হয়। তাদের ফ্ল্যাগশিপ আয়োজন ‘চলচ্চিত্র উৎসব’ ইতিমধ্যে দুইবার অনুষ্ঠিত হয়েছে। দ্বিতীয় উৎসবে রেদওয়ান রনি, রায়হান রাফী ও খন্দকার সুমনের মতো নির্মাতারা অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। নির্মাতা খন্দকার সুমন সেখানে ‘সাঁতাও’ সিনেমা নিয়ে বলেছিলেন, সিনেমাটি তৈরির বহু বছর পর তা তার আসল গন্তব্য—মাটি ও কৃষির সঙ্গে যুক্ত মানুষের কাছে পৌঁছেছে।

সংগঠনটির বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ও সহপ্রতিষ্ঠাতা নওশিন মাইশা জানান, অনেক সদস্য এখন নিজেরাই চিত্রনাট্য লিখছেন এবং শুটিং-এডিটিং শিখছেন। সংগঠনের সভাপতি ও সহপ্রতিষ্ঠাতা মো. আল আমিন নিজেও ‘তাণ্ডব’ সিনেমার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং দলের অনেকে ‘দম’ চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন। এসএইউএফএস ইতিমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও ইউনেসকো আয়োজিত ‘লেটস টক ওয়েলবিয়িং’ ভিডিও প্রতিযোগিতায় ২২টি বিশ্ববিদ্যালয়কে পেছনে ফেলে প্রথম স্থান অর্জন করেছে। এ ছাড়া জাতীয় চলচ্চিত্র সংসদ সম্মেলন ২০২৬ ও জাতীয় চলচ্চিত্র আর্কাইভের কর্মশালায়ও তারা সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছে।

বড় আয়োজনগুলোতে পৃষ্ঠপোষকতার অভাব তাদের জন্য একটি নিয়মিত সংকট। কখনো নিজেদের পকেটের টাকা, আবার কখনো মাসিক চাঁদা বা শিক্ষকদের অনুদানে তারা কার্যক্রম চালিয়ে নিচ্ছেন। আল আমিন জানান, আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যে তারা এসএইউএফএসকে দেশের অন্যতম সক্রিয় ফিল্ম সোসাইটি হিসেবে দেখতে চান এবং জাতীয় পর্যায়ের একটি চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজনের স্বপ্ন দেখেন। নওশিন মাইশার কথায়, এটি কেবল ট্রফি বা ভিউ গণনার বিষয় নয়, বরং এমন একটি জায়গা যেখানে শিক্ষার্থীরা নিজেদের গল্প বলার সাহস খুঁজে পায়।

এরই মধ্যে দুটি উৎসবের আয়োজন করেছেন তাঁরা।‘চলচ্চিত্র উৎসব ২.০’-তে অতিথি হয়ে এসেছিলেন রেদওয়ান রনি, রায়হান রাফী ও খন্দকার সুমনের মতো নির্মাতারা।