অলসতা ও উদাসীনতা যেভাবে মানুষের জীবন ধ্বংস করে প্রকাশিত: ১২:৩৩ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৮, ২০২৬ মানুষের মন ও পরিস্থিতি সবসময় পরিবর্তনশীল। এই পরিবর্তনশীল মনকে সঠিক পথে রাখতে প্রয়োজন নিয়মিত যত্ন, আত্মশুদ্ধি ও নিয়ন্ত্রণ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, 'পক্ষান্তরে যে স্বীয় প্রতিপালকের সামনে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে ও প্রবৃত্তি থেকে নিজকে বিরত রাখে, জান্নাতই হবে তার আবাস।' (সুরা নাজিয়াত : ৪০-৪১)। কিন্তু এই মনকে যখন গাফিলতি বা উদাসীনতা গ্রাস করে, তখন মানুষের দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ই ধ্বংসের মুখে পড়ে। মানুষের অন্তরের দ্রুত পরিবর্তনের বিষয়টি হাদিসেও গুরুত্বের সাথে বর্ণিত হয়েছে। মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ (রা.) বলতেন, তিনি কারও শেষ পরিণতি না দেখে তার ভালো-মন্দ নিয়ে মন্তব্য করেন না। কারণ তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছেন, আদম সন্তানের হৃদয় এমনভাবে বদলায়, যেমন ফুটন্ত হাঁড়ির পানি উল্টে-পাল্টে ওঠে (মুসনাদে আহমদ)। কবিদের মতেও, মানুষকে 'ইনসান' বলা হয় কারণ সে ভুলে যায়, আর হৃদয়কে 'হৃদয়' এ জন্য বলা হয় যে এটি বারবার বদলায়। শাহর ইবনে হাওশাব (রহ.) একবার উম্মে সালামা (রা.)-এর কাছে জানতে চেয়েছিলেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) ঘরে থাকা অবস্থায় সবচেয়ে বেশি কোন দোয়াটি পড়তেন। উত্তরে উম্মে সালামা (রা.) জানান, রাসুলুল্লাহ (সা.) বেশি বেশি বলতেন, 'হে অন্তর পরিবর্তনকারী, আমার হৃদয়কে তোমার দ্বীনের ওপর স্থির রাখো।' এর কারণ হিসেবে নবীজি (সা.) বলেছিলেন, মানুষের হৃদয় আল্লাহর দুটি আঙুলের মাঝে থাকে; তিনি যাকে ইচ্ছে দৃঢ় রাখেন, আর যাকে ইচ্ছে পথভ্রষ্ট করে দেন (তিরমিজি : ৩৫২২)। মানবজীবনের অন্যতম বড় বিপর্যয় হলো 'গাফলত' বা উদাসীনতা। এটি মানুষের সময়, শক্তি ও সামর্থ্যকে অপচয় করে হৃদয়কে মৃতপ্রায় করে ফেলে এবং সব ভালো কাজ থেকে মানুষকে বঞ্চিত রাখে। গাফলত মূলত আল্লাহকে ভয় না করা, তাঁর ইবাদত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া এবং সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য ভুলে গিয়ে আখেরাতের প্রস্তুতির বিষয়ে উদাসীন থাকাকে বোঝায়। এই উদাসীনতা মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে দূরে সরিয়ে পাপের সাগরে ডুবিয়ে দেয়। এমনকি চারপাশে বড় কোনো বিপদ বা শাস্তি এলেও গাফিল ব্যক্তিরা তা নিয়ে সচেতন হয় না। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন, 'অবশ্যই মানুষের মধ্যে অনেকে আমার বহু নিদর্শন সম্বন্ধে গাফিল।' (সুরা ইউনুস : ৯২)। এছাড়া সুরা রুমের ৬-৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, অধিকাংশ মানুষ পার্থিব জীবনের বাহ্যিক দিক নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও আখেরাত সম্পর্কে উদাসীন এবং তারা নিজেদের সৃষ্টি ও প্রতিপালকের সাথে সাক্ষাতের বিষয়ে চিন্তা করে না। মানুষের এই উদাসীনতা ও ভুলে যাওয়ার পেছনে শয়তানের প্ররোচনা একটি বড় পরীক্ষা। তবে কোনো মুমিন যদি কখনো গাফিলতিতে পড়েও যায়, তাকে দ্রুত তাওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসতে হবে। শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে বাঁচতে আল্লাহর আশ্রয় নেওয়ার নির্দেশ দিয়ে সুরা আরাফের ২০০-২০২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, শয়তানের প্ররোচনা দেখা দিলে আল্লাহর স্মরণ করতে হবে, এতে তাকওয়াবানদের চোখ খুলে যায়। উদাসীন ব্যক্তিরা প্রায়ই তাওবা করতে বিলম্ব করে এবং ইবাদত পিছিয়ে দেয়, অথচ তাদের সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে। সুরা ইউনুসের ৭-৮ আয়াতে আল্লাহ সতর্ক করেছেন যে, যারা পার্থিব জীবনেই সন্তুষ্ট এবং আল্লাহর নিদর্শন সম্পর্কে গাফিল, তাদের ঠিকানা হবে জাহান্নাম। সময় নষ্ট করা এবং অবসরকে মূল্যায়ন না করা গাফিলতির আরেকটি প্রধান কারণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'দুটি নিয়ামত আছে, যেগুলোর ব্যাপারে অনেক মানুষ প্রতারিত হয়: সুস্থতা ও অবসর।' (বোখারি : ৬৪১২)। কিয়ামতের দিন নিজের জীবন ও যৌবন কোথায় অতিবাহিত করেছে, তার হিসাব দেওয়ার আগে কোনো বান্দা পা নাড়াতে পারবে না (তিরমিজি : ২৪১৬)। এছাড়া উদাসীন ও গাফিল লোকেদের সাথে মেলামেশাও মানুষকে লক্ষ্যচ্যুত করে। তাই আল্লাহ তাআলা তাঁর নবীকে সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহকে স্মরণকারীদের সংসর্গে ধৈর্য ধরে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন এবং যারা খেয়াল-খুশির অনুসরণ করে ও আল্লাহর স্মরণে অমনোযোগী, তাদের আনুগত্য করতে নিষেধ করেছেন (সুরা কাহফ : ২৮)। বর্তমান যুগে গাফিলতির সবচেয়ে বড় মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে মোবাইল, টেলিভিশন ও বিভিন্ন ডিজিটাল ডিভাইসের স্ক্রিন। এসব ডিভাইসে বুঁদ হয়ে মানুষ মূল্যবান সময় নষ্ট করছে এবং বিভ্রান্তিকর ও গুনাহের কাজে জড়িয়ে পড়ছে। এর ফলে অনেকে কুরআন তিলাওয়াত, জ্ঞানচর্চা বা আল্লাহর কাছে একান্তে প্রার্থনা করার সময় পাচ্ছে না। অথচ আল্লাহ তাআলা সুরা আম্বিয়ার ১-৩ নম্বর আয়াতে অত্যন্ত কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, মানুষের হিসাব-নিকাশের সময় ঘনিয়ে এলেও তারা উদাসীনতায় মুখ ফিরিয়ে রেখেছে এবং যেকোনো নতুন উপদেশ তারা কৌতুকচ্ছলে অমনোযোগী হৃদয়ে শ্রবণ করে। SHARES অন্যান্য বিষয়: ইসলামউদাসীনতাকুরআনগাফিলতিজীবন গঠনহাদিস