গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়াতে নতুন নিরাপত্তা চুক্তি

প্রকাশিত: ৩:০২ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬

আর্কটিক অঞ্চলে সামরিক ও কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে একটি নতুন নিরাপত্তা চুক্তিতে সমঝোতায় পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই চুক্তির মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ডে ওয়াশিংটনের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতি ও প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার পথ তৈরি হচ্ছে, যা মূলত ওই অঞ্চলে রাশিয়া ও চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকানোর একটি বড় প্রয়াস। তবে এই চুক্তির অধীনে দ্বীপটির ওপর ডেনমার্কের সার্বভৌমত্ব এবং গ্রিনল্যান্ডের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার পুরোপুরি বহাল থাকবে।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা নিয়ে এই সমঝোতার ঘোষণা দেন। ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগামী সপ্তাহে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হতে পারে। অবশ্য চুক্তিটি চূড়ান্তভাবে কার্যকর করার আগে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জাতীয় সংসদে এটি অনুমোদিত হতে হবে। চুক্তির পূর্ণাঙ্গ আইনি দলিল এখনো প্রকাশ না হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার সুনির্দিষ্ট পরিধি এবং ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ ঠিক কতটা থাকবে, তা নিয়ে কিছু প্রশ্ন রয়ে গেছে。

প্রস্তাবিত চুক্তির আওতায় গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক প্রবেশাধিকার, নতুন ঘাঁটি ও অবকাঠামো নির্মাণ এবং আকাশপথ ব্যবহারের অধিকার থাকবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন, দ্বীপটির উপযুক্ত এলাকায় বড় ধরনের সামরিক উপস্থিতি গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হবে। এই চুক্তির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো রাশিয়া ও চীনের মতো নন-ন্যাটো দেশগুলোর গ্রিনল্যান্ডে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন বন্ধ করা। এমনকি কৌশলগত কিছু বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদনের প্রয়োজন হতে পারে বলে মার্কিন কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, এই চুক্তি গ্রিনল্যান্ডকে উত্তর আমেরিকার কৌশলগত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ধরে রাখতে সাহায্য করবে।

ট্রাম্পের পূর্ববর্তী অবস্থানের সঙ্গে এই সমঝোতার বড় অমিল হলো, এখানে গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করার কোনো প্রস্তাব নেই। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেট্টে ফ্রেডেরিকসেন এবং গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেন্স ফ্রেডেরিক নিলসেন নিশ্চিত করেছেন যে, ডেনমার্কের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা অক্ষুণ্ণ থাকবে। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ভবিষ্যতে গ্রিনল্যান্ড যদি স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হয়, তাহলেও চুক্তির সামরিক ও আকাশপথ ব্যবহারের অধিকারসংক্রান্ত ধারাগুলো বহাল রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে ২০০৯ সালের সেল্ফ-গভর্নমেন্ট অ্যাক্ট অনুযায়ী গ্রিনল্যান্ডের জনগণ অভ্যন্তরীণ বিষয়ে স্বায়ত্তশাসন ভোগ করলেও পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতি ডেনমার্কের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে।

এই নতুন সমঝোতাটি মূলত ১৯৫১ সালের ঐতিহাসিক গ্রিনল্যান্ড প্রতিরক্ষা চুক্তির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠছে, যা পরবর্তীতে ২০০৪ সালের আইগালিকু চুক্তিসহ বিভিন্ন সংশোধনীর মাধ্যমে পরিমার্জিত হয়েছে। বর্তমানে গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা হলো 'পিটুফিক স্পেস বেস' (সাবেক থুলে এয়ার বেস)। আর্কটিক অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্রের আগাম সতর্কতা, মহাকাশ পর্যবেক্ষণ এবং উত্তর আমেরিকার সামগ্রিক প্রতিরক্ষায় এই ঘাঁটির গুরুত্ব অপরিসীম। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মাঝে অবস্থিত গ্রিনল্যান্ড সামরিক যোগাযোগ ও নজরদারির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বরফ গলার ফলে সৃষ্ট নতুন সমুদ্রপথ ও প্রাকৃতিক সম্পদের কারণে অঞ্চলটি নিয়ে বিশ্বশক্তির প্রতিযোগিতা বাড়ছে।

চুক্তির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এলেও বেশ কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন রয়ে গেছে। নতুন মার্কিন ঘাঁটিগুলো ঠিক কোথায় হবে, সেখানে কত সেনা মোতায়েন করা হবে এবং এই বিশাল সামরিক অবকাঠামো নির্মাণের ব্যয়ভার কে বহন করবে—তা এখনো স্পষ্ট করা হয়নি। এছাড়া কৌশলগত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের সীমা এবং গ্রিনল্যান্ড স্বাধীন হলে চুক্তির ধারাগুলো কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা জানতে পূর্ণাঙ্গ আইনি দলিল প্রকাশ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসের হিসাব অনুযায়ী গ্রিনল্যান্ডের জনসংখ্যা মাত্র ৫৬ হাজার ৭৪০ জন হলেও ভূরাজনৈতিক দিক থেকে এই চুক্তিটি বিশ্ব ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।