মাঠ পর্যায়ের সাংবাদিকদের নির্ভয়ে লেখার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে: সুহাসিনী হায়দার

প্রকাশিত: 11:00 PM, July 24, 2026

গণমাধ্যমের ওপর জন-আস্থা ফিরিয়ে আনতে মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদকেরা নিজেদের চোখে যা দেখেন, তা নির্ভয়ে লেখার অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন ভারতের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা দ্য হিন্দুর কূটনৈতিক সম্পাদক সুহাসিনী হায়দার। শুক্রবার রাজধানীর একটি হোটেলে ঢাকা ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিটিকস (দায়রা) আয়োজিত ‘বেঙ্গল ডেল্টা কনফারেন্স-২০২৬’-এর ‘মিডিয়া রাইটস অ্যান্ড রেসপন্সিবিলিটিজ’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় তিনি এ কথা বলেন।

সুহাসিনী হায়দারের মতে, বর্তমান সময়ে গণমাধ্যমের সবচেয়ে বড় সংকট সরাসরি সরকারি সেন্সরশিপ নয়, বরং সাংবাদিকদের মধ্যে গড়ে ওঠা স্ব-সেন্সরশিপ। তিনি বলেন, অতীতে গণমাধ্যমের ওপর চাপ ছিল প্রকাশ্য—সরকার নিষিদ্ধ করত, সাংবাদিকদের কারাগারে পাঠাত কিংবা মালিকপক্ষের রাজনৈতিক অবস্থান সংবাদ পরিবেশনকে প্রভাবিত করত। কিন্তু এখন সাংবাদিকেরা নিজেরাই নানা কারণে সংবাদের সীমা টেনে দিচ্ছেন। একজন প্রশিক্ষিত সাংবাদিকের সঙ্গে সাধারণ নাগরিকের পার্থক্য হলো সাংবাদিক তথ্য যাচাই করেন, সব পক্ষের বক্তব্য নেন এবং ঘটনাকে বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করে ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির আওতায় আনেন। সাংবাদিকের কাজ হলো জনগণের পক্ষে দাঁড়িয়ে সত্যকে ক্ষমতার সামনে তুলে ধরা।

সুহাসিনী হায়দার আরও বলেন, ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের পর বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তাবাদী ও কর্তৃত্ববাদী নেতৃত্বের উত্থান ঘটেছে। একই সঙ্গে বহুত্ববাদ, মানবাধিকার, বেসরকারি সংস্থা ও স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর চাপ বেড়েছে। এ পরিস্থিতি শুধু একটি দেশের নয়, বিশ্বের অনেক দেশের সাংবাদিকদের অভিন্ন বাস্তবতা। গণমাধ্যমের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সুহাসিনী বলেন, সবার হাতে ক্যামেরা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থাকলেও পেশাদার সাংবাদিকতার প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে যায়নি। মানুষের আস্থা অর্জনের জন্য গণমাধ্যমকে নির্ভরযোগ্য তথ্য, বিশ্লেষণ ও প্রেক্ষাপট দিতে হবে। তিনি আরও যোগ করেন, গণমাধ্যমের কাজ তথ্য দেওয়া, শিক্ষিত করা ও ঘটনার প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করা, বিনোদন দেওয়া নয়। এ ছাড়া গণমাধ্যমকে টেকসই করতে প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুবিধা কাজে লাগিয়ে ব্যয় কমানোর পাশাপাশি বিজ্ঞাপননির্ভরতার পরিবর্তে পাঠকনির্ভর রাজস্ব মডেলের দিকে যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। এতে গণমাধ্যম স্বার্থগোষ্ঠীর কাছে কম জবাবদিহি থাকবে এবং স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে।

প্যানেল আলোচনায় নেপালের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক কনক মানি দিক্ষিত বলেন, পশ্চিমা মিডিয়াকে আগে আদর্শ মনে করা হলেও এখন প্রতিটি দেশের নিজস্ব মানদণ্ড নির্ধারণ করা উচিত। গাজা ইস্যুতে নিউ ইয়র্ক টাইমসসহ পশ্চিমা মিডিয়ার দুর্বলতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঢাকা, কাঠমান্ডু, দিল্লি, ইসলামাবাদ বা কলম্বো—আমাদের প্রত্যেককেই নিজেদের মানদণ্ড নিজেরা ঠিক করতে হবে, অন্য কাউকে আদর্শ মানার প্রয়োজন নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইনফ্লুয়েন্সার সংস্কৃতির উত্থানে প্রচলিত সংবাদমাধ্যমের অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা এখন আগের চেয়ে বেশি জরুরি।

গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান ও দ্য ডেইলি স্টারের কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদ বলেন, সংবাদপত্রের প্রচার সংখ্যা কমছে এবং মানুষ এখন কম সাংবাদিকতা করছে। তিনি টেলিভিশন টক শোগুলোকে সাংবাদিকতা নয়, বরং ‘কথার দোকান’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সাংবাদিকদের যা দেখার কথা, তা রিপোর্ট করতে হবে, কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না। সেশনটি পরিচালনা করেন ঢাকা ট্রিবিউনের সাবেক সম্পাদক জাফর সোবহান।