অনলাইন জুয়ায় সর্বস্বান্ত যুবসমাজ, দেশ থেকে পাচার হচ্ছে কোটি টাকা

প্রকাশিত: ৯:৪০ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ২৯, ২০২৬

প্রযুক্তির প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে দেশে অনলাইন জুয়ার অবৈধ ব্যবসা এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। লোভনীয় বিজ্ঞাপনের প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন অ্যাপস, ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেইজের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ এবং যুবসমাজকে এই চক্রগুলো ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই জুয়া বাণিজ্য কেবল ভার্চুয়াল জগতেই সীমাবদ্ধ নয়, এর পেছনে রয়েছে সুসংগঠিত আর্থিক অপরাধের নেটওয়ার্ক, যা সমাজ ও অর্থনীতির জন্য চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) তথ্যমতে, বাংলাদেশে পরিচালিত জুয়ার ওয়েবসাইটগুলোয় মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ব্যবহার করে প্রতিদিন ৭০০ থেকে ১০০০ কোটি টাকার বেশি লেনদেন হচ্ছে। এই অর্থের একটি বড় অংশ ডিজিটাল হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। ডিবিপ্রধান শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, এই চক্রের মূল হোতা নাতানসহ অধিকাংশ নিয়ন্ত্রক চীনের নাগরিক। তারা 'গো পে' নামে একটি কোম্পানির মাধ্যমে এই কার্যক্রম পরিচালনা করত। ডিবির সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টারের যুগ্ম কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ জানান, দেশের চক্রগুলো মূলত কমিশনের ভিত্তিতে কাজ করে, আর মূল নিয়ন্ত্রণ থাকে চীন থেকে।

বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে দেশে অনলাইন জুয়ার লেনদেন বেড়েছে ২১ গুণ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই খাতে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। এই অনৈতিক কর্মকাণ্ডে চাকরিজীবী, গৃহিণী, তরুণ প্রজন্মের পাশাপাশি জেলে ও কৃষকরাও জড়িয়ে পড়েছেন, যাদের মাধ্যমে প্রায় ৫ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। অনলাইন জুয়ায় আসক্ত হয়ে অনেকেই আর্থিকভাবে নিঃস্ব হচ্ছেন, যা পারিবারিক সহিংসতা ও আত্মহত্যার মতো মর্মান্তিক ঘটনার দিকে ধাবিত করছে।

বিটিআরসির পক্ষ থেকে ওয়ানএক্সবেট, মেলবেট, লিনবেট, সেফিয়ারবেট, বেট অন গেম, মেগাপারি, পিন-আপ বেট, বাজিওকে ও ফেয়ারপ্লে-এর মতো সাইট বন্ধের কথা বলা হলেও, নাম পরিবর্তন করে বা সামান্য কৌশল বদলে এগুলো আবারও ফিরে আসে। সিআইডি প্রধান ব্যারিস্টার মোহাম্মদ মোশাররফ হোছাইন জানিয়েছেন, সিআইডির বিশেষায়িত ইউনিট নিয়মিত এসব সাইট মনিটর করছে এবং সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে বিটিআরসিকে অবহিত করছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অপরাধী চক্রগুলো হাজার হাজার বেনামি এমএফএস অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে এই লেনদেন সম্পন্ন করে। কিছু অসাধু এমএফএস এজেন্ট কমিশনের লোভে এই অবৈধ কাজে সহায়তা করছে। এরপর সংগৃহীত অর্থ ডিজিটাল হুন্ডির মাধ্যমে ক্রিপ্টোকারেন্সি বা বিদেশি মুদ্রায় রূপান্তর করে আন্তর্জাতিক সাইটগুলোর মালিকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। বিএফআইইউ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ পর্যন্ত ৫৫ হাজারেরও বেশি এমএফএস অ্যাকাউন্ট অবরুদ্ধ বা স্থগিত করেছে এবং সন্দেহভাজন অনেক এজেন্টের ব্যবসায়িক অনুমোদন বাতিল করেছে। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কেবল ওয়েবসাইট ব্লক করা যথেষ্ট নয়; এর পেছনে থাকা গডফাদার এবং অসাধু এজেন্টদের আইনের আওতায় না আনতে পারলে এই সর্বনাশা পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।