বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক: বাড়ছে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি প্রকাশিত: ৭:৩০ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬ পদ্মা সেতু চালুর পর থেকেই দক্ষিণাঞ্চলের সড়কগুলোতে যানবাহনের ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে। তবে সেই তুলনায় বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কের প্রশস্ততা বাড়েনি। ১৬৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই মহাসড়কের একটি বড় অংশ মাত্র ২৪ ফুট চওড়া। এর ওপর অসংখ্য ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক থাকায় প্রতিনিয়ত ঘটছে ভয়াবহ সব দুর্ঘটনা, ঝরছে প্রাণ। উজিরপুরের সানুহার, বামরাইল, নতুন শিকারপুর, জয়শ্রী ও ইচলাদীসহ বিভিন্ন এলাকার বিপজ্জনক বাঁকগুলো দীর্ঘ দিন ধরে চালক, যাত্রী ও পথচারীদের জন্য আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অপরিকল্পিত বাঁক, অতিরিক্ত গতি এবং ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিংয়ের কারণে এসব এলাকায় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। ২০২২ সালের ২৯ মে ভোরে সানুহারের বাঁকে যমুনা লাইন পরিবহনের একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছে ধাক্কা দিলে ঘটনাস্থলেই ১০ যাত্রী নিহত ও অন্তত ২১ জন আহত হন। এর দুই দিন পর একই স্থানে বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে আরও দুজন নিহত হন। সর্বশেষ গত মার্চের শেষ দিকে ওই এলাকায় ট্রাক ও থ্রি-হুইলারের সংঘর্ষে একজন নিহত হন। স্থানীয়দের মতে, শুধু উজিরপুর অংশেই অন্তত আটটি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক রয়েছে। সানুহার বাজারের চা দোকানি মো. ছগির জানান, এই বাঁকগুলোতে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো দুর্ঘটনা ঘটে এবং মৃত্যুর সংখ্যাও অনেক। চালকদের দাবি, দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন, প্রয়োজনীয় গতিরোধক তৈরি এবং ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকগুলো প্রশস্ত ও সোজা করা জরুরি। মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে প্রায় ৭০টি বাঁক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে গৌরনদীর ভূরঘাটা, টরকী, আশোকাঠি, মাহিলাড়া, বাটাজোড়, কটকস্থল, পিঙ্গলাকাঠি, কসবা, বাবুগঞ্জের নতুনহাট, রহমতপুর, এয়ারপোর্ট মোড়, ক্যাডেট কলেজ, পাংশা, সাতমাইল, ছয়মাইল, বরিশাল সদরের গড়িয়ারপার, কাশিপুর, রেইন্ট্রিতলা, খয়রাবাদ ব্রিজ, দপদপিয়া ও নলছিটি জিরো পয়েন্ট, বাকেরগঞ্জের লক্ষ্মীপাশা, বোয়ালিয়া, ভরপাশা, চরামদ্দি, আমতলীর শাখারিয়া, ব্রিকস ফিল্ড, কলাপাড়ার মহিষাকাটা, চুনাখালী ও কেঁওড়াবুনিয়াসহ বিভিন্ন এলাকা অন্যতম। বাংলাদেশ রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে বরিশাল বিভাগে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ২ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন। ২০২১ সালে ৫৮৭ জন, ২০২২ সালে ৫১১ জন, ২০২৩ সালে ৪১১ জন, ২০২৪ সালে ৪৫৭ জন এবং ২০২৫ সালে ৪২১ জন নিহত হন। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, বরিশাল বিভাগে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের বড় একটি অংশ বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কের দুর্ঘটনার শিকার। তিনি আরও বলেন, পদ্মা সেতু পার হওয়ার পর ঢাকা থেকে আসা বাসগুলো মাত্র ২৪ ফুট প্রশস্ত মহাসড়কে চলে আসে, কিন্তু আগের গতিতে চালাতে গিয়ে বাঁকগুলোতে দুর্ঘটনা ঘটে। সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ জানিয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকগুলো সোজা করার জন্য একটি প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। পটুয়াখালী সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী জামিল আক্তার লিমন জানান, পায়রা সেতু থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত ২০টি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকের মধ্যে কয়েকটিতে সতর্কতামূলক চিহ্ন দেওয়া হয়েছে। তবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির বরিশাল বিভাগীয় সাধারণ সম্পাদক খন্দকার ইমাম হোসেন নাসির দাবি করেন, পায়রা সেতু থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত প্রায় ৩০টি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক রয়েছে এবং শীত মৌসুমে কুয়াশার কারণে দুর্ঘটনা আরও বাড়ে। বরিশাল অংশের সড়ক নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের সাবেক চালক কালাচাঁদ দাস জানান, নথুল্লাবাদ থেকে ভূরঘাটা পর্যন্ত প্রায় ৪০টি বাঁক রয়েছে, যার মধ্যে ১৮ থেকে ১৯টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বরিশাল জেলা বাস মালিক গ্রুপের সভাপতি মোশাররফ হোসেন জানান, বরিশাল অংশের ৫৬ কিলোমিটার মহাসড়কে ৪০ থেকে ৪২টি বাঁক রয়েছে। বরিশাল সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল ইসলাম জানান, বরিশাল অংশে ৩৬টি বাঁক চিহ্নিত করা হয়েছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মহাসড়ক ২৪ ফুট থেকে ৩২ ফুট পর্যন্ত প্রশস্ত করা হয়েছে। সওজের তথ্য অনুযায়ী, পদ্মা সেতু চালুর আগে ভূরঘাটা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত প্রতিদিন ১৬ থেকে ১৯ হাজার যানবাহন চলাচল করত, যা বর্তমানে ২৫ থেকে ৩০ হাজারে দাঁড়িয়েছে। সওজ অধিদপ্তর বরিশাল জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, যানবাহন চলাচল প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায় সরু সড়কে চাপের কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে। তিনি আরও বলেন, ছয় লেনের সড়ক নির্মাণ হলে এ মহাসড়কে প্রাণহানি অনেকাংশে কমে আসবে। বরিশাল বিআরটিএর পরিচালক জিয়াউর রহমান জানান, দুর্ঘটনায় চালকের অসচেতনতা প্রমাণিত হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং প্রয়োজনে ড্রাইভিং লাইসেন্স বাতিল করা হচ্ছে। SHARES দুর্ঘটনা বিষয়: ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকপদ্মা সেতুবরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কসড়ক ও জনপথসড়ক দুর্ঘটনা