নরসিংদীতে মহাসড়কের জমি অধিগ্রহণে ১১০ কোটি টাকা লোপাটের ছক ফাঁস

প্রকাশিত: ১২:১১ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২৬

২০২৬ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর (14 September 2026) প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, নরসিংদীতে সাসেক ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণে বড় ধরনের অনিয়ম ও সরকারি অর্থ লোপাটের একটি চাঞ্চল্যকর ছক উন্মোচিত হয়েছে। প্রকল্পের একটি মাত্র এলএ (ভূমি অধিগ্রহণ) কেসের নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অপ্রয়োজনীয় জমি ও স্থাপনা দেখিয়ে সরকারের ১১০ কোটি ৩৯ লাখ ৪৫ হাজার ৬৩৪ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে তদন্তের পর প্রায় সাড়ে ৪ একর জমি বাদ পড়ায় সরকারের এই বিপুল পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) প্রাথমিক প্রস্তাবে এলএ কেস ০৯/২১-২২-এর অধীনে ১৪ একর ২৬ দশমিক ৩৮ শতক জমি অধিগ্রহণের কথা বলা হয়েছিল। পরবর্তীতে এই प्रस्तावের প্রয়োজনীয়তা ও যৌথ তদন্তের ফিল্ডবহি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে নরসিংদীর তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মাহমুদা বেগমকে আহ্বায়ক করে সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির নিবিড় তদন্তে প্রথমে ৩ একর ১২ দশমিক ৯২ শতক জমি বাদ দেওয়া হয়। এরপর চূড়ান্ত যাচাই ও অ্যালাইনমেন্ট সংশোধনের পর অধিগ্রহণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৯ একর ৮৫ দশমিক ১৫ শতকে। অর্থাৎ, প্রাথমিক প্রস্তাবের চেয়ে চূড়ান্ত অধিগ্রহণে প্রায় সাড়ে ৪ একর জমি বাদ পড়ে, যার ফলে অবকাঠামোর ক্ষতিপূরণ বাবদ সরকারের শতকোটি টাকারও বেশি বেঁচে যায়। নরসিংদী অংশে এই প্রকল্পের অধীনে এমন মোট ৮টি এলএ কেস রয়েছে।

তদন্তে গুগল আর্থে তৈরি খসড়া অ্যালাইনমেন্ট নিয়েও গুরুতর অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। কারারদি মৌজার নথিতে দেখা গেছে, রাস্তার প্রস্থ কোথাও ১৬০ ফুট আবার কোথাও ১৮০ ফুট পর্যন্ত দেখানো হয়েছে। অথচ এই সীমানার মধ্যে সিএনজি স্টেশন, বিভিন্ন কলকারখানা, বহুতল ভবন ও দোকানপাট রয়েছে। তদন্তে দেখা যায়, এসব স্থাপনার অনেকগুলোই সওজের আগে অধিগ্রহণ করা জমির মাত্র ১০ ফুটের মধ্যে অবস্থিত। ফলে নতুন করে জমি অধিগ্রহণ না করে পূর্বের জায়গা ব্যবহার করেই রাস্তা উন্নয়ন সম্ভব বলে গত ৭ জানুয়ারির তদন্ত প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়।

এছাড়া বিসিক শিল্পনগরীর সরকারি জমি ও অবকাঠামো বিসিকের নামে নথিভুক্ত না করে, তা লিজগ্রহীতা বেসরকারি শিল্পমালিকদের নামে ফিল্ডবহিতে অন্তর্ভুক্ত করার মতো মারাত্মক অনিয়ম পাওয়া গেছে। এর ফলে প্রকৃত মালিকানা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি এবং সরকারি জমিতে বেসরকারি ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার পথ সুগম করা হয়েছিল। পাশাপাশি দক্ষিণ নোয়াদিয়া, ব্রাহ্মণদী, লামপুর, শাষপুর, কুমড়াদি, মুনসেফচর ও কামারগাঁওসহ বেশ কয়েকটি মৌজায় যৌথ তদন্তের ফিল্ডবহিতে বাস্তবতার চেয়ে অবকাঠামোর পরিমাপ অনেক বেশি দেখানো হয়েছিল, যা ক্ষতিপূরণের অঙ্ককে অন্যায্যভাবে বাড়িয়ে দেয়।

এই অনিয়ম রুখতে এবং অপ্রয়োজনীয় জমি বাদ দিতে প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলেন তৎকালীন এডিসি (রাজস্ব) মাহমুদা বেগম। কিন্তু সততার পুরস্কার হিসেবে তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিতে চার দফায় বদলির চেষ্টা চালানো হয়। সংশ্লিষ্টদের দাবি, জেলার একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির (ভিআইপি) টেলিফোনের পর তাকে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে বদলি করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এ বিষয়ে নরসিংদীর বর্তমান জেলা প্রশাসক ইশরাত জাহান কেয়া জানান, তিনি যোগদানের পর থেকেই এ বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়সহ একাধিক তদন্ত চলমান রয়েছে। ভূমি মন্ত্রণালয় দীর্ঘ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিলেও তিনি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু পাননি। তবে তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং সরকারি অর্থের কোনো অপচয় বা একই জমি দ্বিতীয়বার অধিগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হবে না বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।