গোয়েন্দা ব্যর্থতায় হাতছাড়া হলো পাচার হওয়া ৩০৭ কোটি টাকা

প্রকাশিত: ৯:০২ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬

বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া ২৫ মিলিয়ন ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩০৭ কোটি টাকার সন্ধান পেয়েছিল যুক্তরাজ্যের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (এনসিএ)। ইউবিএস এজি ব্যাংকের লন্ডন শাখায় থাকা এই বিপুল পরিমাণ অর্থ জব্দ করে বাংলাদেশের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে (বিএফআইইউ) অবহিত করা হয়েছিল। তবে আইনি বাধ্যবাধকতার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য ও আইনি ভিত্তি পাঠাতে ব্যর্থ হয়েছে বিএফআইইউ। ফলে জব্দ রাখার চার সপ্তাহের সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পর সেই অর্থ লন্ডন থেকে কৌশলে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

প্রাপ্ত নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ইস্টার্ন ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শওকত আলী চৌধুরীর একটি ব্যাংক হিসাবে এই অর্থ ছিল। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে এনসিএ এই হিসাবের তথ্য বাংলাদেশকে জানায়। সে সময় ঢাকায় শওকত আলীর বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগের তদন্ত চলছিল। এনসিএ’র পক্ষ থেকে দফায় দফায় যোগাযোগ করে জানতে চাওয়া হয়েছিল, বাংলাদেশে শওকত আলীর বিরুদ্ধে কী ধরনের আইনি প্রক্রিয়া চলছে, কারা তদন্ত করছে এবং এই অর্থের সঙ্গে কোনো অপরাধের সরাসরি যোগসূত্র আছে কি না। একই সঙ্গে দেশে তার কোনো সম্পদ ক্রোক বা জব্দ করা হয়েছে কি না, তাও জানতে চায় বৃটিশ সংস্থাটি।

বাংলাদেশি গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে এসব প্রশ্নের কার্যকর জবাব ও আইনি ভিত্তি সরবরাহ করা গেলে যুক্তরাজ্যের আদালতের মাধ্যমে অর্থটি আটকে রাখার পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া যেত। কিন্তু বিএফআইইউ সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি। গত ২২শে ফেব্রুয়ারি বিএফআইইউ জানায়, শওকত আলী বাংলাদেশে তদন্তকারী সংস্থাগুলোর কাছে একজন ‘পারসন অব ইন্টারেস্ট’। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) অনুসন্ধান চালাচ্ছে। তবে সেই তদন্তগুলো তখনো প্রাথমিক অনুসন্ধান পর্যায়ে থাকায় সুনির্দিষ্ট অপরাধের সঙ্গে অর্থের যোগসূত্র প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি।

গত ২৫শে ফেব্রুয়ারি বিএফআইইউ আরও জানায়, শওকত আলী বিদেশে অবস্থান করছেন এবং বাংলাদেশে আটক নেই। তার বিরুদ্ধে তদন্তকারী কর্মকর্তাদের মধ্যে ছিলেন এনবিআর-এর যৌথ কর কমিশনার মোহাম্মদ দাউদ হোসেন, সিআইডি-এর পরিদর্শক গোলাম সরোয়ার এবং দুদক-এর উপ-পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান। জবাবে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালের ১লা জুলাই থেকে ২৯শে আগস্ট পর্যন্ত শওকত আলীর হিসাব সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছিল, তবে পরে তা আর বাড়ানো হয়নি। এছাড়া দেশে তার কোনো সম্পদ ক্রোকের ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি।

এরই মধ্যে ২৩শে ফেব্রুয়ারি এনসিএ কর্মকর্তা ইয়ান পোর্টার জানান, বাংলাদেশি তদন্ত সংস্থাগুলোর সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের জন্য প্রয়োজনীয় অপারেশনাল ব্যবস্থা বা ওএসজেএ তখনো অনুমোদিত ছিল না। ফলে তথ্য আদান-প্রদান আরও সীমিত হয়ে পড়ে। ২৫শে ফেব্রুয়ারি এনসিএ দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দেয় এবং ২৭শে ফেব্রুয়ারি তাদের আন্তর্জাতিক দুর্নীতি দমন সমন্বয় কেন্দ্র জানায়, তারা এ বিষয়ে আর কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে বাংলাদেশ মামলা করে অভিযোগপত্র দিলে এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধ উভয় দেশে অপরাধ হিসেবে গণ্য হলে আদালতে যাওয়ার সুযোগ তখনও ছিল।

আইনি লড়াইয়ের ক্ষেত্রে বিএফআইইউ একটি বড় ভুল করে। তারা যুক্তরাজ্যের কাছে দাবি করে যে, শওকত আলী বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া এই অর্থ বিদেশে পাঠিয়েছেন। কিন্তু যুক্তরাজ্যে ১৯৭৯ সালের অক্টোবর মাসেই বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ বিধিনিষেধ বিলোপ করা হয় এবং ১৯৮৭ সালের ফাইন্যান্স অ্যাক্টের মাধ্যমে ১৯৪৭ সালের এক্সচেঞ্জ কন্ট্রোল অ্যাক্ট আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করা হয়। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন না থাকাটি দেশীয় আইনে অপরাধ হলেও বৃটিশ আইনে তা অপরাধ নয়। এনসিএ এমন অপরাধের প্রমাণ চেয়েছিল যা দুই দেশের আইনেই অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়, যা দিতে ব্যর্থ হয় বিএফআইইউ।

নথি অনুযায়ী, গত ৩রা জানুয়ারি যুক্তরাজ্যের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা প্রথম বাংলাদেশি এক নাগরিকের অর্থের তথ্য জানায়। এরপর ৯ই ফেব্রুয়ারি এনসিএ তাদের গোয়েন্দা প্রতিবেদনে শওকত আলী চৌধুরীর নাম ও ইউবিএস এজি লন্ডন শাখার হিসাবের তথ্য উল্লেখ করে। এই অর্থ লন্ডনে প্রায় চার সপ্তাহ আটকে ছিল। কিন্তু প্রয়োজনীয় আইনি ভিত্তির অভাবে বৃটিশ কর্তৃপক্ষ অর্থটি ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় এবং শওকত আলী তা দুবাইয়ে সরিয়ে নেন।

লন্ডনে অর্থ আটকে থাকার বিষয়টি প্রথম সামনে আসে গত ৮ই জুন। সেদিন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান সম্পাদক পরিষদের সঙ্গে এক বৈঠকে জানান, যুক্তরাজ্যে ২৫ মিলিয়ন ডলারের ‘স্টোলেন অ্যাসেট’ জব্দ করা হয়েছে এবং তা দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। তবে তিনি অর্থটি কার তা জানাননি এবং দাবি করেছিলেন অর্থটি তখনও যুক্তরাজ্যে রয়েছে। কিন্তু এর দুই মাসেরও বেশি সময় পর বিষয়টি আদালতে গড়ালে জানা যায় অর্থটি অনেক আগেই হাতছাড়া হয়েছে। গত ২৫শে আগস্ট হাইকোর্ট শওকত আলীর অর্থ দুবাইয়ে স্থানান্তরের অভিযোগের অনুসন্ধান ৩০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে দুদককে নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে এনসিএ’র তথ্যের ভিত্তিতে সময়মতো ব্যবস্থা না নেওয়ায় বিএফআইইউ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কেন আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তা জানতে রুল জারি করেন আদালত।

যুক্তরাজ্যের সুযোগ হারানোর পর এখন সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এই অর্থ ফেরানোর চেষ্টা করছে বিএফআইইউ। অন্যদিকে, গত ১৫ই মার্চ এনবিআর-এর বৃহৎ করদাতা ইউনিট শওকত আলীর বিরুদ্ধে ৩০৬ কোটি ৮৭ লাখ ৫০ হাজার টাকার কর দাবি করে ৩০শে মার্চের মধ্যে তা পরিশোধের সময় দিয়েছিল। এই অর্থ পরিশোধ না করলে দেশে থাকা তার সম্পদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তী সরকারের শ্বেতপত্র কমিটির হিসাব অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে, যার বার্ষিক গড় পরিমাণ প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার। পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে বর্তমান সরকার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে একটি আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠন করেছে এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে পারস্পরিক আইনি সহায়তার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।