স্বাস্থ্যসেবার মূল লক্ষ্য হোক মানুষের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছানো

প্রকাশিত: ৬:৫৫ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৪, ২০২৬

চিকিৎসা প্রদানের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সঠিক ধারণা দেওয়া এবং সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করা যেকোনো স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এভারকেয়ার হাসপাতাল চট্টগ্রামের হেড অব ডিজিটাল, ব্র্যান্ড অ্যান্ড পিআর মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন মামুনের মতে, চিকিৎসকের বছরের পর বছর অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা যদি কেবল চিকিৎসাকক্ষের চার দেয়ালের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তার সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পুরোপুরি পৌঁছায় না। তাই জটিল স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্যগুলো সহজ ও বোধগম্য ভাষায় মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া জরুরি।

একজন চিকিৎসক তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারে পড়াশোনা, প্রশিক্ষণ এবং রোগী দেখার মাধ্যমে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন, তা সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। হৃদরোগ, ক্যান্সার, কিডনি রোগ, শিশুর স্বাস্থ্য কিংবা স্নায়ুরোগের মতো জটিল বিষয়গুলোতে চিকিৎসকদের এই অভিজ্ঞতা সাধারণ মানুষ জানতে পারলে তারা স্বাস্থ্য সম্পর্কে আরও সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। কোন লক্ষণগুলো অবহেলা করা উচিত নয় এবং কখন বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন—এমন তথ্যগুলো সহজভাবে উপস্থাপন করতে পারলে চিকিৎসকের সঙ্গে সাধারণ মানুষের যোগাযোগের দূরত্বও কমে আসবে। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরতে হবে।

মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন মামুন মনে করেন, স্বাস্থ্যবিষয়ক যোগাযোগের মূল উদ্দেশ্য কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা পাওয়া হওয়া উচিত নয়। এর প্রকৃত লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষকে নির্ভরযোগ্য ও সত্য তথ্য সরবরাহ করা। সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য কত মানুষ দেখল, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো মানুষ সেটি কতটা বুঝতে পারল এবং তা থেকে উপকৃত হলো কি না। গণমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে চিকিৎসকদের সাক্ষাৎকার, ভিডিও বার্তা ও নিবন্ধের সাহায্যে এই জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।

তবে তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে অত্যন্ত দায়িত্বশীল হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তিনি। কোনো রোগের লক্ষণ নিয়ে অতিরঞ্জিত দাবি করা কিংবা আতঙ্ক ছড়ানো থেকে বিরত থাকতে হবে। একটি লক্ষণকে কোনো রোগের একমাত্র প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা যেমন ভুল, তেমনি চিকিৎসার ফলাফল সম্পর্কে অতিরঞ্জিত প্রত্যাশা তৈরি করাও অনুচিত। প্রতিটি রোগীর শারীরিক অবস্থা ভিন্ন হওয়ায় সাধারণ তথ্য যে ব্যক্তিগত চিকিৎসার বিকল্প হতে পারে না, তা স্পষ্ট করা অত্যন্ত জরুরি।

এই ধরনের উদ্যোগ সফল করতে চিকিৎসক, জনসংযোগ কর্মকর্তা এবং ডিজিটাল কন্টেন্ট টিমের মধ্যে নিবিড় সমন্বয় প্রয়োজন। মানুষের মধ্যে প্রচলিত ভুল ধারণা দূর করা এবং তাদের মনে থাকা বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর সহজভাবে তুলে ধরাই হওয়া উচিত বিষয় নির্বাচনের মূল মাপকাঠি। এক্ষেত্রে চিকিৎসকরা তথ্যের যথার্থতা নিশ্চিত করবেন এবং যোগাযোগের দায়িত্বে থাকা দলগুলো তা সহজ ভাষায় সাধারণের উপযোগী করে উপস্থাপন করবে। তবে সেটিকে প্রধান উদ্দেশ্য না করে তথ্যের যথার্থতা, মানুষের উপকার এবং বিষয়গুলো সহজে বোঝার সুযোগ তৈরিকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।

এসব কাজের ক্ষেত্রে রোগীর গোপনীয়তা, অনুমতি এবং চিকিৎসকের পেশাগত সীমারেখা বজায় রাখা মৌলিক শর্ত। রোগীর বিবরণ বা অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে যথাযথ অনুমতি গ্রহণ এবং প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা অনুসরণের কোনো বিকল্প নেই। সঠিক তথ্য পাওয়ার ফলে মানুষ নিজেদের স্বাস্থ্য নিয়ে প্রশ্ন করতে এবং প্রয়োজনে পেশাদার পরামর্শ নিতে উৎসাহিত হয়, যা শেষ পর্যন্ত একটি স্বাস্থ্যসচেতন সমাজ গঠনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

পরিশেষে, স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়ন ও প্রতিষ্ঠানের পরিচিতি বাড়াতে এমন সচেতনতামূলক কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ। তবে সেই পরিচিতি যেন তথ্যের সত্যতা ও মানুষের কল্যাণের চেয়ে বড় না হয়ে যায়। বাংলাদেশে স্বাস্থ্য তথ্যের ক্রমবর্ধমান চাহিদার এই সময়ে চিকিৎসকের দক্ষতার আসল প্রকাশ যেমন চিকিৎসাসেবার মাধ্যমে ঘটে, তেমনি সেই দক্ষতার অর্জিত জ্ঞান যখন দায়িত্বশীলতার সঙ্গে মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়, তখনই স্বাস্থ্যসেবা প্রকৃত অর্থবহ হয়ে ওঠে।