শিক্ষা ও আবাসন সংকটে ইউরোপজুড়ে ফুঁসে উঠেছে জেন-জি তরুণরা প্রকাশিত: ৪:০৭ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৫, ২০২৬ শিক্ষা খাতের বাজেট কাটছাঁট, বাড়িভাড়ার সীমাহীন বৃদ্ধি, আবাসনসংকট এবং জীবনযাত্রার বাড়তি খরচে বিপর্যস্ত হয়ে ইউরোপের বড় একটি অংশজুড়ে রাজপথে নেমেছে তরুণেরা। ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, পর্তুগাল, গ্রিস, সার্বিয়া, আলবেনিয়া ও বেলজিয়ামসহ একাধিক দেশে জেনারেশন জেড বা জেন-জিদের এই আন্দোলন এখন বড় ধরনের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জে ফেলেছে সংশ্লিষ্ট সরকারগুলোকে। বিভিন্ন দেশের আন্দোলনের কারণ ভিন্ন হলেও সব প্রতিবাদের মূলেই রয়েছে ভবিষ্যৎ নিয়ে তরুণের ক্ষোভ ও জমে থাকা হতাশা। ইউরোপীয় তরুণদের বড় আশঙ্কা—তাঁদের বাবা-মায়ের প্রজন্ম যেসব সুযোগ-সুবিধা পেয়েছিলেন, বর্তমান আর্থসামাজিক বাস্তবতায় তাঁরা আর তা পাবেন না। স্পেনে সাম্প্রতিক আন্দোলনের সূচনা হয় ৮৭ বছর বয়সী মারিকারমেন অ্যাবাসকালকে নিজ বাড়ি থেকে উচ্ছেদের একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে। এই ঘটনা দেশটিতে বাড়িভাড়া বৃদ্ধি ও আবাসনসংকট নিয়ে তরুণের ক্ষোভ দাবানলের মতো জ্বালিয়ে দেয়, যার প্রভাব পড়ে প্রতিবেশী পর্তুগালেও। অন্যদিকে ফ্রান্সে আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছেন শিক্ষার্থীরা। বিদ্যালয়ে তীব্র শিক্ষকসংকট, জরাজীর্ণ অবকাঠামো, জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয় এবং সরকারি ব্যয় সংকোচনের প্রতিবাদে রাজপথে নামেন জেন-জি তরুণেরা। ফ্রান্সে লাখো মানুষের বিক্ষোভে শহরে শহরে কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করা হয় এবং তা সহিংসতা, গণলুটপাট ও ব্যাপক ধরপাকড়ে রূপ নেয়, যেখানে গ্রেপ্তার করা হয় প্রায় ১০০০ (1000) জনকে। প্যারিস, মার্সেই, লিওঁ, লিল, অর্লেয়া ও বোর্দো শহরে এই মিছিলে যোগ দেয় শিক্ষার্থী সংগঠন ইউএনইএফ, সর্ববৃহৎ শ্রমিক সংগঠন সিজিটি, কৃষক, জলবায়ুকর্মী এবং ২০১৮ সালের জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধিবিরোধী ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের সদস্যরা। গত বুধবার ফ্রান্সে সরকারি বন্ডের মুনাফার হার ২০০২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়, যা দেশটির বাজেট সরকারের ওপর চাপ আরও বাড়িয়েছে। ইতালিতেও তরুণের ক্ষোভের আঁচ তীব্র হয়েছে। গত ৭ অক্টোবর রোমের একটি হাইস্কুলে ‘ফ্রান্সের মতো’ স্লোগান লিখে আন্দোলন শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। রোমের শিক্ষার্থী এলিসা পাস্তোরে জানান, খরচ বাঁচাতে তাঁর ভাই আগে ১২০ কিলোমিটার (৭৫ মাইল) দূর থেকে ক্যাম্পাসে যাতায়াত করতেন। পরে তিনি রোমে এলে দুই ভাই-বোন মিলে একটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে থাকেন, কিন্তু সেই ভাড়া মেটাতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে। গত সপ্তাহান্তে ইতালির ছাত্রনেতা সাবরিনা ব্রিজোলা এক সমাবেশে বলেন, ‘আমরা এমন বিদ্যালয় চাই, যেগুলোর ছাদ ধসে আমাদের মাথায় পড়বে না। আমরা নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কাজ চাই, চাই সরকারি স্বাস্থ্যসেবা আর সামাজিক ন্যায়বিচার।’ তবে ইতালির শিক্ষামন্ত্রী জুসেপ্পে ভালদিতারা দাবি করেছেন, তাঁদের দেশের পরিস্থিতি ফ্রান্সের থেকে ভিন্ন। ফরাসি কট্টর ডানপন্থীরা দ্বিতীয় প্রজন্মের অভিবাসীদের খাপ খাওয়ানোর জটিলতাকে দায়ী করলেও ইতালিতে এমন সমস্যা নেই বলে মত দেন তিনি। ইতালিতে শুধু শিক্ষার্থীরাই নন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও জ্বালানি সংকটের কারণে ট্রাকচালকেরাও আন্দোলনে নেমেছেন, যার প্রভাবে মোজারেলা পনির ও পাস্তা উৎপাদন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। গ্রিসের এথেন্সসহ বিভিন্ন স্থানে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও শিক্ষক রাজপথে মিছিল করেছেন। এথেন্সে পার্লামেন্ট ভবনের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভকারীরা স্লোগান দেন, ‘গ্রিস থেকে ফ্রান্স—আমরা বিনা মূল্যের সরকারি শিক্ষা চাই।’ অন্যদিকে পর্তুগালের লিসবনের রোসিও চত্বরে প্রতি সন্ধ্যায় তাঁবু টাঙিয়ে অবস্থান নেন হাজারো মানুষ, যেখান থেকে গত মঙ্গলবার ভোরে ৫৫ জনকে আটক করা হয়। বিক্ষোভকারীদের হাতে থাকা পতাকায় লেখা ছিল ‘কাসাস পারা মোরার’, যার অর্থ ‘বসবাসের জন্য বাড়ি চাই’। তাঁরা বাড়িভাড়া বৃদ্ধির ওপর সীমা নির্ধারণ এবং উচ্ছেদ সহজ করার নতুন আইন বাতিলের দাবি জানান। এছাড়া বেলজিয়ামেও ফরাসি আন্দোলনের অনুকরণে বিক্ষোভে নেমে ১০৭ জন আটক হয়েছেন। আলবেনিয়া ও সার্বিয়ায় জেন-জিদের আন্দোলন মূলত সরকারবিরোধী রূপ নিয়েছে। আলবেনিয়ায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা ও উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনারের যুক্ত থাকা একটি বিলাসবহুল ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা থেকে আন্দোলন শুরু হয়। দীর্ঘদিনের এই বিক্ষোভ এখন দুর্নীতি দমন ও প্রধানমন্ত্রী এদি রামের পদত্যাগের দাবিতে রূপ নিয়েছে। রাম পদত্যাগের দাবি প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ইইউতে যোগদানের প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগ তুলেছেন। অন্যদিকে সার্বিয়াতেও দুই বছর ধরে চলা শিক্ষার্থীদের জোরালো বিক্ষোভের মুখে রোববারের পার্লামেন্ট নির্বাচনে বড় চ্যালেঞ্জে পড়েছেন দেশটির দীর্ঘদিনের শাসক আলেকসান্দার ভুসিচ। ইউরোপীয় শিক্ষার্থী সংগঠনগুলো এখন পরস্পরের সঙ্গে পরামর্শ ও কৌশল ভাগ করে নিচ্ছে। ফ্রান্সের শিক্ষার্থী সংগঠন ইউএনইএফের ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যালিস দ্য ব্রিতো জানান, শিক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয় এবং সামগ্রিকভাবে তরুণদের জন্য রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি আবাসনসংকট মোকাবিলায় সব দেশের তরুণের দাবি মূলত এক। ইউরোপজুড়ে নতুন কর্মসূচির ডাকও দেওয়া হয়েছে। জার্মানিতে ৩১ অক্টোবর ‘জেন-জেড রেগেল্ট’ নামের সংগঠন বিক্ষোভ করবে। ফ্রান্স ও স্পেনের শ্রমিক সংগঠনগুলো যথাক্রমে ৫ ও ১১ নভেম্বর ধর্মঘটের ঘোষণা দিয়েছে। আর ২০ নভেম্বর ইতালি ও যুক্তরাজ্যের শিক্ষার্থী সংগঠনগুলো শিক্ষার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে এক দিনের কর্মসূচি পালন করবে। ইউরোপীয় সংবাদমাধ্যম ‘ইউরোপিয়ান করেসপনডেন্ট’-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক জুলিয়াস ফিন্টেলমান সিএনএনকে জানান, রাজনীতি পরবর্তী প্রজন্মের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় জমে থাকা হতাশার বহিঃপ্রকাশ ঘটছে এই বিক্ষোভগুলোতে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রভাবে কর্মজীবনের শুরুর দিকের চাকরিগুলোর ঝুঁকি, জলবায়ু সংকট এবং দক্ষিণ ও পশ্চিম ইউরোপের অর্থনৈতিক দুর্বলতা জেন-জিদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। তিনি মন্তব্য করেন, ‘উদার গণতন্ত্রের মৌলিক প্রতিশ্রুতি ছিল পরবর্তী প্রজন্ম আগের চেয়ে ভালো জীবন পাবে, কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি এখন ভেঙে পড়ছে।’ SHARES আন্তর্জাতিক বিষয়: আন্তর্জাতিকআবাসন সংকটইউরোপজেন জিবিক্ষোভশিক্ষা সংকট