লোহিত সাগরের সুরক্ষায় বাংলাদেশসহ ১৪ দেশের নতুন জোট

প্রকাশিত: 10:34 AM, July 31, 2026

লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দেব প্রণালি এবং এডেন উপসাগরে নিরাপদ নৌ-চলাচল ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ অক্ষুণ্ণ রাখতে বাংলাদেশসহ ১৪টি দেশের সমন্বয়ে একটি নতুন বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছে সৌদি আরব। 'মাল্টিন্যাশনাল মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালায়েন্স' নামের এই জোটটি মূলত যৌথ সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করার লক্ষ্যে কাজ করবে। বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে এই জোট গঠনের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে।

এই উদ্যোগটি এমন এক সময়ে নেওয়া হলো যখন ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের হামলায় বাব আল-মান্দেব ও লোহিত সাগর রুট চরম ঝুঁকিতে পড়েছে। বিশেষ করে গত সপ্তাহে হুথিরা সৌদির বিরুদ্ধে সামুদ্রিক অবরোধের ঘোষণা দিলে লোহিত সাগরমুখী তেল পরিবহন ব্যাহত হয়। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনার কারণে হরমুজ প্রণালি ঘিরে আগে থেকেই অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় চাপ সৃষ্টি করেছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষে ইরানকে ঘিরে সংঘাত শুরু হলে হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়ে। তবে সৌদি আরব তাদের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের মাধ্যমে পূর্বাঞ্চলীয় শোধনাগার থেকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে তেল পরিবহন সচল রাখতে পারলেও রপ্তানির জন্য বাব আল-মান্দেব পার হওয়া অপরিহার্য।

ভৌগোলিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালিটি ইরিত্রিয়া, জিবুতি ও ইয়েমেনের মাঝখানে অবস্থিত। মাত্র ২৯ কিলোমিটার প্রশস্ত এই সংকীর্ণ জলপথটির ইয়েমেন অংশ হুথিদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় সেখানে জাহাজে হামলার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিশ্বের মোট সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ এবং প্রতিদিন কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল জ্বালানি তেল এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই রুটে যেকোনো ধরনের বিঘ্ন বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে মূল্যবৃদ্ধির চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জোটভুক্ত দেশগুলোর প্রধান লক্ষ্য হবে ভারত মহাসাগরকে ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে যুক্ত করা এই কৌশলগত সমুদ্রপথে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা রক্ষা করা। সৌদি আরব ছাড়াও এই জোটের অন্য সদস্য দেশগুলো হলো বাংলাদেশ, তুরস্ক, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, জর্ডান, মিসর, পাকিস্তান, জিবুতি, সোমালিয়া, ইয়েমেন, সুদান ও কোমোরোস। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান এখনো এই জোটে যোগ দেয়নি, যদিও চলমান সংকটে তাদের নিরাপত্তা স্বার্থও অনেকটাই একই ধরনের। প্রয়োজনীয় জাতীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর অন্যান্য দেশের জন্যও এই জোটে যোগদানের সুযোগ উন্মুক্ত থাকবে বলে জানানো হয়েছে।

জোট গঠনের বৈঠকে আমন্ত্রিত ৫১টি দেশের মধ্যে ৪৩টি দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন, যেখানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) একটি প্রতিনিধিদলও উপস্থিত ছিল। ইইউর নিজস্ব নৌ নিরাপত্তা মিশন 'অ্যাসপিডিস' থাকলেও সৌদির নেতৃত্বাধীন এই নতুন জোটের কার্যক্রম কীভাবে আলাদা হবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। জোটে কোন দেশ কতটি যুদ্ধজাহাজ বা বিমান দেবে তা প্রকাশ করা না হলেও জানানো হয়েছে যে, এর মাধ্যমে মূলত গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ পরিকল্পনা, সমন্বিত মহড়া এবং সামুদ্রিক অভিযান পরিচালনা করা হবে। সৌদি আরব জোর দিয়ে বলেছে যে, এই জোটের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক এবং এটি কোনো নির্দিষ্ট দেশকে লক্ষ্য করে গঠিত হয়নি। জোটটির সদর দপ্তর সৌদি আরবেই স্থাপন করা হবে।