দ্য হেগের কারাগারে মারা গেলেন ‘বসনিয়ার কসাই’ রাতকো ম্লাদিচ প্রকাশিত: ১২:০২ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৮, ২০২৬ নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগের একটি কারাগারে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন সাবেক সার্বীয় সামরিক প্রধান ও ‘বসনিয়ার কসাই’ হিসেবে পরিচিত রাতকো ম্লাদিচ। ১৯৯৫ সালের কুখ্যাত স্রেব্রেনিৎসা হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দেওয়ার অপরাধে তিনি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করছিলেন। গতকাল বৃহস্পতিবার সার্বিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আরটিএস তাঁর মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করেছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তিনি বেশ কয়েকবার স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছিলেন। জীবনের শেষ দিনগুলোতে ম্লাদিচের শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছিল। তাঁর পরিবার ও সার্বিয়ার সরকারি কর্মকর্তারা মানবিক কারণে তাঁকে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য দ্য হেগের ট্রাইব্যুনালে আবেদন জানিয়েছিলেন। আইনজীবীদের যুক্তি ছিল, তিনি নিরাময়-অযোগ্য ও মারাত্মক শারীরিক অবস্থায় ভুগছেন, তাই তাঁকে আটকে রাখা অমানবিক। তবে আদালত সেই আবেদন নাকচ করে দেয়। ম্লাদিচের বয়স নিয়েও বিতর্ক রয়েছে; তিনি নিজের জন্মসাল ১৯৪৩ দাবি করলেও ট্রাইব্যুনালের নথিতে তা ১৯৪২ সাল উল্লেখ করা আছে। সাবেক যুগোস্লাভিয়ায় সমাজতন্ত্রের পতনের পর শুরু হওয়া রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে নৃশংসতার জন্য কুখ্যাত তিন সার্ব নেতার অন্যতম ছিলেন এই ম্লাদিচ। তিনি সামরিক দিকটি পরিচালনা করতেন, আর রাজনৈতিক নেতৃত্বে ছিলেন সাবেক যুগোস্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট স্লোবোদান মিলোসেভিচ ও সাবেক বসনিয়ান সার্ব নেতা রাদোভান কারাদজিচ। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত চলা ওই ভয়াবহ যুদ্ধে প্রায় ১ লাখ মানুষ প্রাণ হারান এবং বাস্তুচ্যুত হন ২২ লাখের বেশি মানুষ। এই যুদ্ধের সবচেয়ে নৃশংস অধ্যায়টি রচিত হয়েছিল স্রেব্রেনিৎসায়। সেখানে জাতিসংঘের নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ৮ হাজার বসনীয় মুসলিম পুরুষ ও কিশোরকে ম্লাদিচের নেতৃত্বাধীন সার্ব বাহিনী নির্মমভাবে হত্যা করে। তৎকালীন ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, নারী ও শিশুদের বাসে করে সরিয়ে নেওয়ার আগে ম্লাদিচ হাসিমুখে শিশুদের মিষ্টি দিচ্ছেন, অথচ এর পরপরই পুরুষদের বনে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয়। অপরাধের প্রমাণ ঢাকতে পরে গণকবর থেকে লাশ তুলে অন্যত্র সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। এই হত্যাযজ্ঞ থেকে বেঁচে ফেরা অল্প কয়েকজন মানুষ পরবর্তীতে সার্ব বাহিনীর চালানো অমানুষিক নির্যাতন, হত্যা ও ধর্ষণের বিবরণ দেন। ১৯৯৫ সালের নভেম্বরে সাবেক যুগোস্লাভিয়ার জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটিওয়াই) ম্লাদিচের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে। এরপর সামরিক পদ থেকে অপসারিত হলেও দীর্ঘ ১৬ বছর তিনি গ্রেপ্তার এড়িয়ে আত্মগোপনে ছিলেন। সার্বিয়ার সামরিক বাহিনীর প্রচ্ছন্ন মদদে শুরুতে তিনি বিলাসী জীবনযাপন করতেন এবং দেশের একটি অংশের কাছে আজও তিনি নায়ক হিসেবে গণ্য হন। তবে ২০০০ সালে মিলোশেভিচ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তাঁর ওপর চাপ বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত ২০১১ সালের মে মাসে তিনি গ্রেপ্তার হন। ২০১৭ সালে আদালত তাঁকে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়, যা ২০২১ সালে আপিলেও বহাল থাকে। ম্লাদিচকে তথাকথিত ‘বৃহত্তর সার্বিয়া’ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে মুসলিম ও বসনীয়দের জাতিগত নিধনের দায়েও অভিযুক্ত করা হয়েছিল। পুরো বিচার প্রক্রিয়ায় তিনি নিজের অপরাধ অস্বীকার করে আদালতকে ‘পশ্চিমা শক্তির সন্তান’ বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। তৎকালীন ট্রাইব্যুনাল তাঁর অপরাধকে ‘মানবজাতির জানা সবচেয়ে জঘন্যতম অপরাধ’ হিসেবে বর্ণনা করেছিল এবং সাবেক জাতিসংঘ মানবাধিকারপ্রধান জেইদ রা’দ আল-হুসেইন তাঁকে ‘অশুভর প্রতিমূর্তি’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। SHARES আন্তর্জাতিক বিষয়: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালদ্য হেগবসনিয়ার কসাইযুদ্ধাপরাধরাতকো ম্লাদিচস্রেব্রেনিৎসা গণহত্যা